দুর্লভ (প্রায়) ভিসাপ্রাপ্তি

নওরোজ ইমতিয়াজ

১.
২০০৭ সালের মাঝামাঝিতে আমরা বন্ধুরা কয়েকজন মিলে একমত হলাম, রোজার ঈদের ছুটিতে আমাদের সবাই মিলে শিলং-চেরাপুঞ্জি বেড়াতে যাওয়া উচিত।
ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, গোটা পৃথিবীর মাঝে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় চেরাপুঞ্জিতে। সেই জায়গাটা আমাদের সিলেট জেলা থেকে এত কাছে, অথচ একবারও যাওয়া হলো না, এটা মোটেও ভালো কথা না।
আমাদের মধ্যে সবচেয়ে উদ্যোগী মানুষটার নাম মাসুদ পারভেজ। পেশায় ক্রীড়া সাংবাদিক। অসম্ভব ভোজনরসিক হওয়ার কারণে তাকে দেখতে একটু মোটাসোটা দেখায়। তার ওপর গায়ের রঙ ঘোর অন্ধকার বলে তাকে অনেক আফ্রিকার মানুষদের মতোও লাগে। কিন্তু কোনো কারণে হাসতে শুরু করলে ঝকঝকে সাদা দাঁত বের হয়ে পড়ে বলে তাকে তখন শিশুদের মতো সরল দেখায়। সে নিজে অন্যদের নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করতে ভালোবাসে, কিন্তু তাকে নিয়ে পাল্টা ঠাট্টা-মশকরা ধরনের কিছু করতে গেলে সেটা সে কখনই ভালোভাবে মেনে নেয় না।
সেই মাসুদ পারভেজ একদিন কোথা থেকে ভারতের ভিসা পাওয়ার সহজ নিয়মকানুন শিখে এসে আমাদের জানাল, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ম্যানেজারের সঙ্গে সে খাতির বানিয়ে এসেছে। কাজেই আমাদের আর কষ্ট করে সবাইকে লাইনে দাঁড়াতে হবে না। ম্যানেজারের হাতে সবার পাসপোর্ট কোনো রকমে একবার পৌঁছে দিতে পারলেই উনি সেগুলো জমা দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন।
শর্ত শুধু একটাই, সবগুলো ফরম নিখুঁতভাবে পূরণ করতে হবে। কোনো ভুল থাকা চলবে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতেই তখন ভিসার আবেদন জমা নেওয়া হয়।
আমরা গুনে দেখলাম, সব মিলিয়ে আমাদের লোকসংখ্যা প্রায় তিরিশ। এদের মধ্যে আটজনের পাসপোর্টে লেখা আছেÑ তারা পেশায় সাংবাদিক। বাকিরা হয় ছাত্র, নয়তো ব্যবসায়ী কিংবা বেসরকারি কর্মজীবী অথবা গৃহিণী।
অন্যদের নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আট সাংবাদিকের ভিসা পেতে কিছু জটিলতা আছে। ইন্টারভিউ দিতে হবে। কেন যাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি, কতজন যাচ্ছি, কোথায় থাকব, কতদিন থাকবÑ এইসব প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারলে তবেই মিলবে ভিসা।
বিস্তর আয়োজন করে তিরিশজনের পাসপোর্ট জমা নিয়ে খুব সাবধানতার সঙ্গে দেখে-শুনে ভিসার ফরম পূরণ করা হলো। দরকারি কাগজপত্রগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা, কয়েকবার করে সবাই মিলে সেসব পরীক্ষা করে দেখা হলো।
তারপর কোনো এক সুন্দর সকালে আমি আর মাসুদ পারভেজ দুজন দুটা মোটরসাইকেলে চড়ে রাজধানীর গুলশানে স্টেট ব্যাংক ইন্ডিয়ার সামনে উপস্থিত হলাম। সেখানে মূল ফটকের সামনে বিশাল লাইন। শয়ে শয়ে মানুষ পাসপোর্ট আর ভিসার ফরম হাতে ধাক্কাধাক্কি করছে ভেতরে ঢোকার জন্যে। একসঙ্গে এত মানুষের দেশের বাইরে যাওয়ার দরকার পড়ল কেন, সে এক বিরাট রহস্য।
ক্রীড়া সাংবাদিক মাসুদ পারভেজ আমাদের মাঝে সবচেয়ে উদ্যোগী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। সে একে-তাকে ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে গুঁতোগুঁতি করতে করতে অতি অল্প সময়ে গেটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সেখান থেকে চিৎকার করে হাত নাড়তে নাড়তে আমাকে ডাকাডাকি করছে, ‘নওরোজ, এইদিকে চলে আসেন।’
আমরা অনেক যন্ত্রণা করে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ভেতরে ঢুকে ম্যানেজার সাহেবের জন্যে অপেক্ষা করছি।
ভদ্রলোকের নাম এখন আর স্পষ্ট মনে নেই। অনেক আগের কথা তো। নামের শুরুতে ‘ওয়া’ আছে। এখন সেটা ওয়াকার হতে পারে, ওয়াকিল হতে পারে, ওয়াসিম হওয়াটাও বিচিত্র না। তবে আমরা সেই বিভ্রান্তিতে না গিয়ে এখানে তাকে এখানে ‘ওয়া সাহেব’ বলে উল্লেখ করব।
মাসুদ পারভেজের বিস্তর ফোনাফুনির পর ওয়া সাহেব আমাদের সামনে এলেন। লম্বা-চওড়া ফরসা গোলগাল চেহারা। আর্মি-ছাঁট চুল। তিনি সবগুলো পাসপোর্ট বুঝে নিয়ে অমায়িক ভঙ্গিতে বললেন, ‘কোনো চিন্তা নেই। আমি জমা নিয়ে নিচ্ছি। দু-তিনদিন পর এসে নিয়ে যাবেন। আপনারা যাবেন কবে?’
মাসুদ পারভেজ বলল, ‘আমরা যাব ঈদের পরের দিন। হাতে এখনো বিশ-পঁচিশ দিন সময় আছে। ঈদের সময় অনেক ভিড় হয় বলে আমরা আগেভাগেই ভিসার জন্যে চলে এসেছি।’
ওয়া সাহেব বললেন, ‘ভালো করেছেন। হাতে সময় রেখে আসাই ভালো। এখন তো অনেক চাপ। দু-তিনদিনের জায়গায় পাঁচ-ছয় দিনও লেগে যেতে পারে। তবে টেনশন করবেন না। আমি আছি না, সপ্তাহখানেকের মধ্যে পেয়ে যাবেন।’
প্রায় তিরিশজনের পাসপোর্ট আর ভিসা ফরম জমা দিয়ে রসিদ নিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম। মাসুদ পারভেজের অ্যাসাইনমেন্ট আছে। সে গেল স্টেডিয়ামে। আমি রওনা হলাম ট্যুর অপারেটরের অফিসে।
গুলশান-১ গোলচত্বরের কাছাকাছি একটা চিপা গলিতে সেই ট্যুর অপারেটরের অফিস। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের একটা দ্বীপের নামে তাদের নাম। দার্জিলিং আর শিলংয়ের দিকে কেউ বেড়াতে যেতে চাইলে, তাদের চেয়ে সস্তায় আর কেউ নাকি প্যাকেজ ট্যুর অফার করতে পারে না।
আমরা তিরিশজনের বিশাল দল শিলং যেতে চাই শুনে ট্যুর অপারেটরের মালিক আহমেদ হাসান খুশিতে সবগুলো দাঁত বের করে হেসে ফেললেন।
তিনি তৎক্ষণাৎ পুরি-সমুচা আর চায়ের অর্ডার দিতে দিতে বললেন, ‘আপনারা একদম পারফেক্ট টাইমে যাচ্ছেন। এই সময় খুব বেশি ঠান্ডাও পড়ে না। আবার বৃষ্টিও নাই। আকাশ একদম পরিষ্কার। আরাম করে ঘুরবেন।’
‘কিন্তু আমরা তো বৃষ্টি দেখতেই যাচ্ছি। চেরাপুঞ্জি যাব আর বৃষ্টি হবে না, এটা কেমন কথা!’
‘বৃষ্টি তো দেখবেনই। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে ভিজে আবার ঠান্ডা লাগায়ে ফেললে, ঘুরবেন কেমন করে?’
‘আমাদের সাথে রেইনকোট আর ছাতা থাকবে। ভালো কথা, আমাদের কিন্তু গাইড লাগবে না। আপনি শুধু ট্রান্সপোর্ট আর হোটেলের ব্যবস্থা করে দেবেন। সঙ্গে খাবার-দাবার।’
‘গাইড না নিলে আপনাদের খরচ কিছুটা কমে আসবে। আচ্ছা, দেখি কী করা যায়।’
‘আমরা বাজেট ট্যুরিস্ট। যত কম খরচে যাওয়া যায়, তত ভালো।’
আহমেদ হাসানকে কিছু টাকা অ্যাডভান্স দেওয়া হলো। তিনি মুহূর্তেই শিলং শহরের পুলিশ রোডের হোটেল অ্যামবাসিতে পনেরটা রুম বুকিং দিয়ে ফেললেন। হোটেলটা একটু পুরনো, কিন্তু খাবার-দাবার নাকি সেই রকম ভালো।

২.
এর মধ্যে কয়েক দিন পার হয়ে গিয়েছে।
মাসুদ পারভেজ রোজ একবার করে ওয়া সাহেবকে ফোন দিয়ে ভিসার খোঁজখবর নেয়। ওয়া সাহেব বিগলিত ভঙ্গিতে আশ্বাস দিয়ে যান, ‘হয়ে যাবে খুব শিগগিরই। একদম টেনশন করবেন না।’
এক-দেড় সপ্তাহ পার হওয়ার পর আমাদের মধ্যে অল্প অল্প টেনশন শুরু হলো। আমরা আবার স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় উপস্থিত হয়ে ওয়া সাহেবকে ধরলাম, ‘কী ভাই, এত দেরি কেন? আমাদের ইন্টারভিউ কবে?’
ওয়া সাহেব আর্মি-ছাঁট দেওয়ার চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, ‘হয়ে যাবে। একটু দেরি হচ্ছে। অনেক চাপ তো! আপনারা অমুক দিন আসেন।’
আমরা অমুক দিন ভালো জামা-কাপড় পরে যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে আবার ওয়া সাহেবকে খুঁজে বের করি, ‘আমরা এসেছি। আজকে ভিসা পাব তো?’
ওয়া সাহেব যথারীতি আবারও মাথা চুলকান, ‘না তো। মানে, এখনো হয় নাই। মনে হয় কাল-পরশু হয়ে যাবে। আসলে অনেক চাপ তো। একদম টেনশন করবেন না।’
আমরা যথাক্রমে ‘কাল’ ও ‘পরশু’ দু-দফা স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সামনে গিয়ে ঘোরাঘুরি করতে থাকি। এর মধ্যে আমাদের তিরিশ জনের অভিযাত্রী দলের কেউ কেউ ফোন করে হালকা খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে, ‘কী ব্যাপার? ভিসার কী অবস্থা? আমরা কিন্তু স্যুটকেস গোছাতে শুরু করেছি। যাওয়া কনফার্ম তো?’
আমরাও মাথা চুলকাতে চুলকাতে উত্তর দেই, ‘কনফার্ম মানে, একশবার কনফার্ম। ভিসা তো হয়েই গেছে। দুয়েকজনের ফরমে একটু সমস্যা হয়েছে। সেগুলাও ঠিক হয়ে যাবে।’
এর মধ্যে ওয়া সাহেব আমার এবং মাসুদ পারভেজের ফোন ধরা বন্ধ করে দিলেন। রিং বাজতে থাকে, তিনি ধরেন না। আমাদের একটি মাত্র সূত্র, অথচ অদৃশ্য।
প্রবল দুশ্চিন্তায় মাসুদ পারভেজের ক্ষুধামান্দ্য রোগ দেখা দিল। তার নাকি খাওয়া দাওয়া করতে একদমই ভালো লাগে না।
আমি যেটা করলাম, ওয়া সাহেবের মতো আমিও ফোন ধরা বন্ধ করে দিলাম। তিরিশজনের দলের বেশিরভাগ সদস্য ভিসার খোঁজখবর জানতে চেয়ে আমাকেই দিনরাত ফোন করতে থাকে। আমি নিজেই ভিসার খবর জানি না। তাদের কী জানাব!
আমি আর মাসুদ পারভেজ শেষ পর্যন্ত দিনের দুই শিফটে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সামনে পালা করে পাহারা দিতে লাগলাম। ওয়া সাহেব কোনো কারণে অফিস থেকে বের হলেই তাকে পাকড়াও করব। ঘণ্টার পর ঘণ্টার প্রতীক্ষার পর ওয়া সাহেব যখন সত্যি সত্যি বের হন, তখন দেখা যায় আমরা ধরার আগেই আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা শতশত মানুষ তাকে ঘিরে ধরেছে।
আমার পরম বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করলাম, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সামনে যারা ঘোরাঘুরি করে, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই ওয়া সাহেবকে খুব ভালো করে চেনে। তিনি মোটামুটি সবাইকেই ‘একদম টেনশন করবেন না’ জাতীয় আশ্বাস দিয়ে মহা-টেনশনের মধ্যে রেখেছেন।
কাজেই ব্যাংকের বাইরে বের হওয়া মাত্রা এ ধরনের অতর্কিত আক্রমণ সামলে নিতে ওয়া সাহেব অভ্যস্ত। এক পর্যায়ে তিনি কেমন করে জানি শিং মাছের মতো পিছলে ভিড়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে যান।
দুই-তিনবার চেষ্টার পর অবশেষে একদিন তাকে ধরা গেল। তিনি আমাদের সমস্যা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন, ‘বলেন কী! আপনাদের ভিসা এখনো হয়নি? সে কী কথা! আচ্ছা, আমি এখনই খবর নিচ্ছি। আপনারা এক কাজ করেন, কাল সকালে আমাকে একটা ফোন দেন দেখি।’
অতএব তাকে ছেড়ে দিতে হয় এবং পরদিন সকালে তাকে ফোন দিয়ে দেখা যায়Ñ ফোন সুইচড অফ।
আমরা যখন এহেন সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছি, তখন ত্রাতার ভূমিকায় এগিয়ে এলো এই তিরিশ জনের অভিযাত্রী দলের অন্যতম সদস্য এবং আমাদের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বান ও পরোপকারী যুবক হিসেবে পরিচিত জিয়া ইসলাম।
সে একটা মোবাইল নম্বর দিয়ে বলল, ‘এইটা হইল হাইকমিশনের কালচারাল অ্যাটাশের নাম্বার। ওনার নাম সুব্রত। এনারে একটা ফোন দিয়া দেখেন তো। খুব হেলপফুল লোক।’
আমরা অবিলম্বে সেই নম্বরে ফোন করি। ‘হ্যালো, সুব্রতদা, নমস্কার। আমি অমুক পত্রিকা থেকে বলছি। আমরা কয়েকজন মিলে শিলং যাব। ভিসার ফরম জমা দিয়েছি। এখনো ভিসা হচ্ছে না। একটু হেলপ করেন।’
সুব্রতদা ফোনের ওপাশ থেকে অমায়িক গলায় বলেন, ‘সে কী! কবে জমা দিয়েছেন?’
‘তা দু-সপ্তাহ হতে চলল। ভিসা হলো কি হলো না, কিছুই তো জানতে পারছি না। আপনি ভেতরের লোক। আপনি যদি দয়া করে একটু জেনে দেন।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। দেখি কী করা যায়। আজ তো হবে না। চারটে বেজে গেছে। আমার ছুটি। এখনই তো বেরিয়ে যাব। কাল একবার সকালের দিকে ফোন দিয়ে দেখুন না।’
সুব্রতদা পরদিন সকালে বিস্তর খাটাখাটুনি করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেনÑ আমাদের তিরিশজনের ভিসার ফরম প্রক্রিয়াধীন আছে। খুব শিগগিরই হয়ে যাওয়ার কথা। টেনশনের কোনো কারণ নেই।
এবং সেইদিন থেকে সুব্রতদাও ফোন বন্ধ করে ফেললেন। তাকে আর ফোন করে পাওয়া যায় না। এর মধ্যে যারা যারা ভিসার অগ্রগতি জানতে চেয়ে ফোন দিচ্ছে, তাদের সবাইকে বলে দিচ্ছি, ‘ভিসা হয়ে গিয়েছে, তবে পাসপোর্ট হাতে পাইনি এখনো। টেনশনের কোনো কারণ নেই। ব্যাগ গুছিয়ে ফেলেন।’

৩.
হোটেল রিজারভেশন সম্পন্ন। হানিফ এন্টারপ্রাইজের একটা ননএসি বাসও পুরোটা রিজার্ভ করা হয়েছে। ট্যুর অপারেটর আহমেদ হাসান সাহেবকে প্যাকেজের পুরো অর্থ হস্তান্তর করা হয়েছে। অথচ হাতে সময় আর মাত্র দুদিন।
যাত্রার দুদিন বাকি থাকতে ফোন দিল আমাদের আরেক বন্ধু ঝুমুর বারী। ‘তোমরা নাকি শিলং যাচ্ছ? আমারে নিবা?’
‘নিতে তো সমস্যা নাই। কিন্তু ভিসার দায়িত্ব নিতে পারব না। যদি কালকের মধ্যে ভিসা করায় এনে দিতে পারো, তাহলে নিতে সমস্যা নাই।’
‘তোমাদের নাকি এখনো ভিসা হয় নাই? সমস্যা কী?’
আমি গম্ভীর গলায় বলি, ‘কোনো সমস্যা নাই। হয়ে যাবে।’
‘সমস্যা না হলেই ভালো।’
‘আমরা পরশুদিন রাতে ঢাকা থেকে রওনা দিব। তোমারে আজকের মধ্যে ভিসার জন্যে ফরম জমা দিতে হবে।’
‘আচ্ছা, আমার ভিসার জন্যে ভেবো না। আমি আমারটা আর আমার জামাইয়ের ভিসা হাতে-হাতে করায় ফেলব। তুমি আমাদের জন্যে বাসে আর হোটেলে দুজনের জন্যে ব্যবস্থা রেখো। আমরা কিন্তু কনফার্ম যাচ্ছি।’
আমি মোটামুটি নিশ্চিতÑ আমরা এতদিন ঘোরাঘুরি করে যখন ভিসা পাচ্ছি না, ঝুমুর বারীও শেষ মুহূর্তে এসে ভিসা পাবে না। বরং মাঠে নেমে একটু ঘোরাঘুরি করে বুঝুকÑ কত ধানে কত চাল।
ওইদিন বিকেলেই ঝুমুর বারী ফোন করে ধান অনুপাতে চালের হিসাব দিয়ে দিল। ‘নওরোজ, আমাদের ভিসা হয়ে গেছে। এখন কী করতে হবে।’
আমি ভেতরে ভেতরে ভয়ানক হতাশায় মুষড়ে পড়লাম। কিন্তু সেটা তো প্রকাশ করে ফেলা যায় না। কাজেই আনন্দিত গলায় বললাম, ‘ওয়াও! খুব ভালো কথা। তোমাদের পাসপোর্ট আর চাঁদাটা আমার কাছে পৌঁছে দাও। আমি নাম লিস্ট করে ফেলি।’
‘তোমাদের ভিসার কী অবস্থা?’
‘এই তো। ভালো। পেয়ে যাব আজ-কালের মধ্যে।’
‘আজ-কালের মধ্যে পেয়ে যাবা মানে? কাল তো ঈদ। অ্যামবাসি বন্ধ। পরশু তো রাতে রওনাই হচ্ছি।’
‘হ্যাঁ। তার আগেই পেয়ে যাব। একসাথে অনেকগুলি পাসপোর্ট তো। তাই একটু দেরি হচ্ছে।’
‘হুমম। কিন্তু তোমরা না এক মাস আগে ভিসার আবেদন জমা দিয়েছিলে?’
আমার আর কথা বলতে ভালো লাগছে না। কিন্তু সেটাও তো প্রকাশ করে ফেলা ঠিক হবে না। শুকনো গলায় বললাম, ‘চিন্তা কইরো না। হয়ে যাবে।’
‘চিন্তা করব না মানে? তোমরা না গেলে আমরা কার সাথে যাব? আমরা তো শিলংয়ে কাউরে চিনি না।’
‘আমরাও চিনি না। …আচ্ছা, রাখি কেমন?’
আমি চারিদিকে ব্যাকুল হয়ে দলের সদস্যদের ফোন দিতে শুরু করলাম। জরুরি বৈঠক। জিয়া ইসলাম, সাইফুল আজিম, মাসুদ পারভেজ-সহ যারা যারা জ্ঞানী ও বিবেচক ব্যক্তি যে যেখানে ছিল, সবাই এসে উপস্থিত হলো।
আমরা গুলশানের একটা রেস্টুরেন্টে বসে চা-সিঙ্গারা-সমুচা খেতে খেতে পরিস্থিতির গুরুত্ব, ভয়াবহতা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করলাম।
হাইকমিশনের সঙ্গে ভালো লাইনঘাট আছে, এ রকম প্রভাবশালী মানুষদের তালিকা করা হলো।
তারপর মহাউদ্যোগী মাসুদ পারভেজের উদ্যোগে একে একে তাদের প্রত্যেককে ফোন করে আমাদের সমস্যা খুলে বলা হলো।
প্রভাবশালী মানুষদের প্রত্যেকেই দাবি করতে লাগলেন, এভাবে শেষ মুহূর্তে ফোন না দিয়ে আরও আগে থেকে বলা হলে, তারা অবশ্যই একটা না একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন। এখন শেষ বেলায় এসে এতজনের পাসপোর্টের দায়িত্ব নেওয়া কঠিন। তার ওপর আগামীকাল ঈদ। ঈদের মধ্যে তো এইসব কাজ হয় না।

৪.
আগেই বলেছি, মাসুদ পারভেজ আমাদের মাঝে সবচেয়ে উদ্যোগী মানুষ। সে কোথা থেকে হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারির নাম্বার যোগাড় করে ফটাফট ফোন দিয়ে ফেলল। তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে আমাদের পুরো সমস্যাটা গুছিয়ে ব্যাখ্যা করার পর, ফার্স্ট সেক্রেটারি সাহেব একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টও দিয়ে দিলেন।
সেই অনুযায়ী, ঈদের পরদিন সকাল ৯টায় আমরা সেজেগুজে সোজা হাইকমিশনে গিয়ে উপস্থিত হলাম। ফার্স্ট সেক্রেটারি অত্যন্ত দয়াশীল, বিবেচক ও পরোপকারী চরিত্রের মানুষ। তিনি আমাদের চা-বিস্কুট খেতে দিলেন। তারপর মধুর গলায় বললেন, ‘এইবার বলেন, আপনাদের সমস্যা কী?’
মাসুদ পারভেজ আমাদের মাঝে সবচেয়ে শুধু উদ্যোগী মানুষ না, তার ইংরেজি বলার দক্ষতা ব্রিটিশ বা আমেরিকানদের চেয়েও ভালো। সে স্বভাবসুলভ ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে বলতে শুরু করল, ‘আমরা তিরিশজন। বন্ধুবান্ধব আর পরিবার-পরিজন। শিলং যেতে চাই। একমাস আগে ভিসার ফরম জমা দিয়েছি।’
‘আপনারা যাবেন কবে?’
‘আজকে রাতে। রাত ১০টায় বাস।’
‘ভিসা হয়নি, বাসের টিকেট কেটে বসে আছেন?’
‘আসলে অনেক মানুষ তো, দেরি করলে বাসের টিকেট পাব না। এ জন্যে আগেই কেটে রেখেছি।’
ফার্স্ট সেক্রেটারি কী-সব কাগজপত্র দেখছেন। আমাদের ভিসা সংক্রান্ত কাগজপত্রই হওয়ার কথা। কারণ একটু পরে সেখান থেকে মুখ তুলে তিনি বললেন, ‘আপনারা তো হোটেল অ্যামবাসিতে উঠবেন? বুকিং দিয়েছেন?’
‘জি দিয়েছি। অলরেডি ফুল পেমেন্ট দেওয়াও হয়ে গিয়েছে।’
‘বুঝলাম। কিন্তু আপনারা যেসব তথ্য দিয়েছেন, সেগুলোতে তো ভুল আছে।’
আমাদের দুজনের মুখ শুকিয়ে গেল। ‘কী ভুল?’
‘কারও ঠিকানা ভুল। কারও কনট্যাক্ট নাম্বার ভুল। কারও পেশা ভুল। এ রকম ছোটখাটো ভুল সবগুলো ফরমেই আছে।’
এ রকম সময় আমি হলে ঘাড়ের রগ ফুলিয়ে তর্ক শুরু করে দিতাম, ‘মোটেও না। সবগুলো ফরম আমি নিজে পূরণ করেছি। ভুল হতেই পারে না।’
কিন্তু মাসুদ পারভেজ আমাদের মাঝে সবচেয়ে শুধু উদ্যোগী মানুষই না, তার বুদ্ধিমত্তাও অত্যন্ত প্রখর। আমি যেন এই বেকুবি ধরনের কথাবার্তা শুরু করে না দেই, সে জন্যে সে টেবিলের তলা দিয়ে ছোট একটা লাথি মেরে সাবধান হওয়ার ইঙ্গিত করে, ফার্স্ট সেক্রেটারির দিকে তাকিয়ে বিগলিত ভঙ্গিতে বলল, ‘হয়তো ছোটখাটো ভুল হয়ে থাকতেই পারে। সে জন্যে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। পরের বার আরও সাবধান থাকব।’
মাসুদ পারভেজের এই অনন্য বুদ্ধিমত্তায় আমরা তৎক্ষণাৎ উদ্ধার পেয়ে গেলাম। ফার্স্ট সেক্রেটারি সাহেব বললেন, ‘আচ্ছা, আজকেই ভিসা পেয়ে যাবেন। বিকেল ৪টার দিকে কেউ একজন এসে নিয়ে যাবেন। পাসপোর্ট রেডি থাকবে।’
ওইদিন দুপুরেই সুব্রতদা ফোন দিলেন। তার ফোনসেটে নাকি এতদিন কী একটা সমস্যা হচ্ছিল। এ জন্যে তিনি কল দিতে পারেননি। তবে আজ তার ফোনসেট ঠিক হয়ে গিয়েছে। তিনি এটা জানাতে ফোন করেছেনÑ আমাদের ভিসা মোটামুটি রেডি। বিকেল ৪টার দিকে একবার তার অফিসে গেলে, সবগুলো পাসপোর্ট নিয়ে আসা যাবে। তবে অবশ্যই আমরা যেন হাতে একটু সময় নিয়ে আসি, উনি চা না খাইয়ে কিছুতেই আসতে দেবেন না।
অ্যামবাসির সঙ্গে লাইনঘাট ভালো বলে এর আগে যেসব প্রভাবশালী মানুষদের ফোন দেওয়া হয়েছিল, তারাও একে একে ফোন করতে শুরু করলেন। তারা এটা জানাতে ফোন করেছেনÑ আসলে ঈদের আগে অনেক চাপ থাকে তো, তারপরও তারা অনেক চেষ্টা করেছেন।
মনে হয়, আজ বিকেলের দিকে ভিসা হয়েও যাবে। টেনশনের কোনো কারণ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি।

Scroll to Top