শিলংকাণ্ড

নওরোজ ইমতিয়াজ

১.

ডাউকি সীমান্ত থেকে শিলং শহর পর্যন্ত মনে হয় দুই ঘণ্টার পথ।

রাস্তা যতই দুর্গম হোক, যে পরিমাণ ক্লান্ত ছিলাম, তাতে পুরোটা পথ গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু সেটা সম্ভব হলো না। কারণ ড্রাইভারের বামপাশে যে গিয়ার লিভার, আমাকে বসতে হয়েছে সেই গিয়ার লিভারের দুইপাশে দুই পা দিয়ে।

ড্রাইভার সাহেব মোবাইল ফোনে বেশিক্ষণ কথা বলেননি। পাহাড়ি রাস্তা শুরু হওয়ার পর তিনি ঘন ঘন গিয়ার বদল করেছেন। তাকে একটু পর পর গিয়ার লিভার ধরে টানাটানি করতে হয়েছে।

চলন্ত গাড়ির গিয়ার লিভার ধরে নাড়ানো নিশ্চয়ই অনেক হুটোপুটি ধরনের কাজ। দু-পায়ের মাঝখানে নিয়মিত বিরতিতে এ ধরনের হুলুস্থূল করা হচ্ছে, এমন অবস্থায় নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে পারা অনেক কঠিন।

অতএব আমার ঘুম হলো ছাড়া-ছাড়া। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় তীক্ষè মোড় নিতে গিয়ে আমাদের গাড়িটা কাত হয়ে উল্টে যেতে শুরু করেছে অনুভব করে, একটু পরপরই আতংকে আমার ঘুম ভেঙে যেতে লাগল।

শেষ পর্যন্ত ঘুম ভেঙে দেখি, আলো ঝলমলে একটা পুরনো আমলের দালান। তার সামনে বড় বড় করে লেখা : হোটেল অ্যামবাসি।

হোটেল মালিককে টেলিফোনে যতটা নির্দয় মনে হয়েছিল, বাস্তবে দেখা গেল তিনি প্রকৃতপক্ষে খুবই পরোপকারী, অমায়িক, মিশুক আর হাসিখুশি একজন বুড়ো মানুষ। তার নাম সুখদেব সিং, মাথায় বিশাল এক পাগড়ি, তিনি একজন শিখ। কথা বলেন খুবই আন্তরিক ভঙ্গিতে। মুখজুড়ে সারাক্ষণ শিশুদের মতো সরল হাসি।

তিনি আমাদের দেখে খুবই ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘আপনাদের জন্যে একটা সুসংবাদ আছে। আরেকটা দুঃসংবাদ আছে। কোনটা আগে শুনবেন?’

আমি আমার সহযাত্রীদের দিকে তাকালাম। তাদের সবার চোখেমুখে যথারীতি সেই নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি। সুসংবাদ আর দুঃসংবাদের পার্থক্য করার ক্ষমতা তারা সম্ভবত সীমান্ত পার হওয়ার সময়ই হারিয়ে ফেলেছে।

কিন্তু সবাই মিলে একসঙ্গে চুপ করে থাকাটাও নিশ্চয়ই ভালো দেখায় না। আমি হাসিমুখে বললাম, ‘সুসংবাদটাই আগে শুনি।’

সুখদেব সিংয়ের হাসিমুখ বিস্তৃত হলো, ‘আপনাদের ডিনার রেডি। এখনও গরম গরমই আছে। আপনারা তো ডিনারের অর্ডার করেননি। কিন্তু আমি বুদ্ধি করে বানিয়ে রেখেছি। দুপুরে কিন্তু তিরিশ জনের লাঞ্চ নষ্ট হয়েছে।’

‘ভেরি গুড। আর দুঃসংবাদটা কী?’

সুখদেব সিংয়ের হাসি সর্বাধিক বিস্তৃত হলো, ‘আপনারা তো পনেরটা রুমের বুকিং দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের রাতটা আপনাদের একটু কষ্ট করতে হবে। আজ আপনারা পাবেন দশটা রুম। আসলে আজকে অনেক প্রেশার তো। অনেক টুরিস্ট চলে এসেছে। বিকেলের দিকে আমি হোটেলে ছিলাম না, এই ফাঁকে আমার স্টাফরা পাঁচটা রুমে অন্য গেস্ট অ্যালাউ করে ফেলেছে। আমি থাকলে এ ঘটনা কোনো দিন ঘটত না। যাই হোক, আমি খুব স্যরি। শুধু আজকের রাতটাই তো। কাল দুপুরের মধ্যেই আমি বাকি পাঁচটা রুম ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’

আমি আবার আমার সহযাত্রীদের দিকে তাকালাম। সুসংবাদ শুনে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি, দুঃসংবাদেও তাদের কারও মধ্যে কোনো দুঃখ-বেদনা নেই। দিনভর নানাবিধ ধকল সামলাতে গিয়ে সবাই সম্ভবত মানবিক সকল অনুভূতি হারিয়ে খাঁটি রোবটে পরিণত হয়েছে।

সুখদেব সিংয়ের কাছ থেকে দশটা রুমের চাবি বুঝে নিয়ে আমরা নেতা গোছের ব্যক্তিরা রুম বণ্টন করতে বসলাম।

আমাদের দলের বেশিরভাগই হচ্ছে দম্পতি। সিঙ্গেল মানুষ হাতে গোনা কয়েকজন। দশটা দম্পতিকে অবশ্য দশটা রুম বরাদ্দ করে দেওয়া যায়, তাহলে বাকিরা কী করবে? একটা বুদ্ধি বের হলো, বড় বড় রুমগুলোতে দুটো করে দম্পতিকে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। তারপর তারা যা পারে করুক। সবাই যতখানি ক্লান্ত, আশা করা যায়, রুমে ঢুকিয়ে দেওয়া মাত্র তারা তৎক্ষণাৎ ঘুমিয়ে পড়বে।

বিপদ হলো যে দম্পতি একা নয়, তাদের নিয়ে। অর্থাৎ তাদের সঙ্গে হয়তো কারও বোন বা ভাই এসেছে। কিংবা মাঝারি সাইজের একটা বাচ্চা আছে। দেখা গেল, বউটা হয়তো কোনোভাবেই বিছানার মাঝখানে ঘুমাতে রাজি না। কিন্তু তার জামাইয়ের ভাই-বোনকেও হয়তো একই রুমে থাকতে হচ্ছে। সমস্যা হলো, কে কোন পাশে ঘুমাবে?

কোন রুমে কে কার সঙ্গে শেয়ার করবে, সেটা চূড়ান্ত করা মাত্র দেখা গেল প্রত্যেকের মাঝে মানবিক বোধ ও অনুভূতিগুলো ফিরে আসতে শুরু করেছে। বিচিত্র সব আপত্তি আর সমস্যা উদ্ভূত হতে লাগল। এর সঙ্গে ওকে দিলে ভালো হয়। ও এর সঙ্গে রুম শেয়ার করবে না। সে তো ঘুমানোর অনেক নাক ডাকে, তাকে অন্য রুমে দিলে ভালো হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

সমস্যার এখানেই শেষ না।

রুমের চাবি বুঝে নিয়ে রুমে গিয়ে মালপত্র রেখেই বেশিরভাগ লোকজন আবার ফিরে এলো। তাদের কারো রুমের বিছানায় ছারপোকা, কারো রুমে বাতি জ্বলে না, কারুরটায় বাথরুমে নাকি গন্ধ কিংবা ফ্ল্যাশ কাজ করে না, কোনো কোনো রুমে জানালার কাচ নাকি ভাঙা, সেটা দিয়ে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস আসে।

আমি এইসব সমস্যা শোনার পর সমাধানের আশায় সুখদেব সিংয়ের দিকে তাকাই। তিনি হাসিমুখে মাথা দোলাতে থাকেন। এর মানে হলো, শুধু একটা রাতই তো। একটু না-হয় কষ্ট হলোই। এ আর এমন কী! কাল দুপুরের মধ্যেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে!

তার হাসি একটু পরেই নিভে গেল, যখন দেখা গেল, চরম ক্লান্তির কারণে প্রবল খিদে উপেক্ষা করে বেশিরভাগ মানুষই না খেয়ে রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে। বিস্তর ডাকাডাকি করেও তাদের ঘুম থেকে তুলে ডিনার খাওয়ানোর জন্যে ফেরত আনা গেল না।

সুখদেব সিং চোখমুখে কালো করে বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘পরপর দুবেলা খাবার নষ্ট হলো। ছি ছি। খুব খারাপ কথা।’

 

২.

পরদিন আমাদের অনেক পরিকল্পনা ছিল।

এখানে বেড়াতে যাব, ওখানে ঘুরে দেখব। সবাইকে আগে থেকেও বলাও ছিল। কিন্তু সব পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল। কারণ সবার ঘুম ভাঙল সকাল এগারটা থেকে বেলা বারোটার মধ্যে।

সুখদেব সিংকে দেখা গেল অধিক শোকে বিড়বিড় করাও ছেড়ে দিয়েছেন। আমরা নাশতার অর্ডার দিতে ভুলে গিয়েছিলাম, তিনি আগে থেকে (বুদ্ধি করে) সকালের নাশতা বানিয়ে রেখেছিলেন। এরপর অর্ডার দিয়েছেন লাঞ্চের। এখন সবাই যদি এগারটা-বারোটায় ঘুম থেকেই ওঠে, তাহলে নাশতাটা খাবে কখন, আর লাঞ্চটাই বা খাবে কখন?

সুখদেব সিং গম্ভীর গলায় জানতে চাইলেন, ‘আপনারা কি ডিনার খাবেন?’

পর্যাপ্ত ঘুম-টুম দিয়ে আমাদের তিরিশ জনের তখন শক্তিমত্তা আর স্বাভাবিক অনুভূতি ফিরে এসেছে। আমাদের মধ্যে যারা উদ্যোগী আর তৎপর, তারা বলল, ‘এখনও নাশতাই করলাম না। এখনই ডিনারের খবর বলব কেমন করে?’

সুখদেব সিং চোয়াল শক্ত করে বললেন, ‘আপনাদের লাঞ্চও তো প্রায় রেডি। এখনও যদি নাশতা না করেন, তাহলে লাঞ্চ কখন খাবেন?’

আমাদের পক্ষ থেকে বলা হলো, ‘লাঞ্চ খাব কিনা, বুঝতে পারছি না। কারণ আমরা নাশতা করেই বেরিয়ে যাব।’

সুখদেবের অবস্থা হলো প্রায় কেঁদে ফেলার মতো, ‘তাহলে আজকেও লাঞ্চ নষ্ট হবে? রোজ রোজ এত খাবার নষ্ট হলে, কেমন করে চলবে?’

আমাদের মধ্যে যারা একটু বিবেচক, তারা সান্ত¡নার ভঙ্গি করে বলল, ‘আচ্ছা, এক কাজ করা যাক। আপনি বরং ডিনারের পরিকল্পনা বাদ দেন। লাঞ্চটা এখনই সার্ভ করার দরকার নেই। আমরা তো এখন বেরিয়ে যাব। ফিরে আসতে আসতে সন্ধ্যা। তখন না হয় লাঞ্চটাই গরম করে দিলেন। ডিনার হিসেবে ওটাই খেয়ে নিলাম।’

সুখদেবের মুখে হাসি ফিরল। ‘তা, আপনারা কোথায় যাবেন বলে স্থির করেছেন?’

‘তা তো জানি না কোথায় যাব। আশেপাশেই কোথাও যাব নিশ্চয়ই।’

‘কীভাবে যাবেন? গাড়ি ঠিক করা আছে?’

‘তাই তো! গাড়ি তো ঠিক করা নাই। কী করা যায় বলেন তো? আপনিই পরামর্শ দেন।’

সুখদেব সিং একটু ভাবলেন। ‘আচ্ছা, আমিই বলে দিচ্ছি, কোথায় কোথায় যেতে পারেন। আর গাড়িও ঠিক করে দিচ্ছি। আমার একটা পরিচিত মিনিবাস ড্রাইভার আছে। ওকে বললেই চলে আসবে। আজকে দিনের জন্যে হয়তো তিন হাজার রুপি নেবে।’

‘এক মিনিট। দাঁড়ান দাঁড়ান। আমাদের কাছে তো কোনো রুপি নাই। সব ডলার। ডলার ভাঙাতে হবে। সেটা কেমন করে ভাঙাব?’

সুখদেব সিং ঘড়ি দেখলেন। ‘ইশ! আপনারা তো দেরি করে ফেলেছেন। এখন বাজে বেলা বারোটা। আজ তো হাফ ডে। ব্যাংক একটার দিকে বন্ধ হয়ে যাবে। এখান থেকে ব্যাংক পর্যন্ত যেতে আধঘণ্টা লাগবে। তাহলে আপনাদের এখনই রওনা হওয়া উচিত। নইলে ব্যাংক খোলা পাবেন না।’

এবার আমাদের কাঁদো কাঁদো অবস্থা হলো। আমরা তো এখন ঘুরতে বের হবো। সবাই মিলে ডলার ভাঙাতে গেলে কোনো ফায়দা নেই। একজন গেলেই যথেষ্ট। কিন্তু কে এখন আত্মত্যাগ করে ডলার ভাঙাতে যাবে?

সুখদেব সিংয়ের পরোপকারী সত্ত্বা এবার আত্মপ্রকাশ করল। ‘কোনো চিন্তা নেই। আমার লোক যাবে। আপনারা কে কত ডলার ভাঙাবেন, তার কাছে দিয়ে দিন। সে ডলার ভাঙিয়ে নিয়ে আসবে। আপনারা যখন সন্ধ্যায় ফিরে আসবেন, তখন বুঝে নেবেন।’

‘কিন্তু আমরা যে এখন বের হবো, বাসের ভাড়া কীভাবে দেব? কিছু কিনে খেতে ইচ্ছা করলে, কীভাবে খরচ করব? আমাদের কাছে তো কোনো রুপি নাই।’

সুখদেবের হাসি আকর্ণ বিস্তীর্ণ হলো। ‘কোনো চিন্তা নাই। আমি আপনাদের দু-হাজার রুপি হাওলাত দিচ্ছি। আপনারা ফিরে এসে আমাকে ফেরত দেবেন।’

সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।

আমরা অল্প কিছুক্ষণের মাঝেই একটা প্রাচীন আমলের একটা লক্কর-ঝক্কর বাসে (সম্ভবত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উপমহাদেশে শাসন করতে আসার সময় বাসটি নিজেদের চলাফেরার সুবিধা জন্যে নিয়ে এসেছিল, পরে এই জনপদ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে ফেরত নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছে) চড়ে শিলংয়ের আশেপাশের দর্শনীয় এলাকা দেখতে বের হলাম।

 

৩.

শিলং ছোটখাটো নিরিবিলি একটা শহর।

আমাদের ভাঙাচোরা বাসটা শহর ছেড়ে বের হয়ে গোঁ-গোঁ করতে করতে খাড়া পাহাড়ি রাস্তা ধরে উঠে যেতে থাকে।

আসার সময় যেসব পাহাড় দেখে আমরা অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম, এখন সত্যি সত্যি সেই পাহাড়ের ওপর উঠে যাচ্ছি। পাহাড়ের ওপর দিয়ে পিচ আর পাথর ঢালাই করে অপূর্ব সুন্দর আঁকাবাঁকা রাস্তা বানানো হয়েছে। দুপাশে গাছপালা, ঝোঁপঝাড়, জঙ্গল।

আকাশে এক ফোঁটা রোদ নেই। কিন্তু কেমন জানি ধোঁয়া-ধোঁয়া পরিবেশ।

জিনিসটা আসলে কুয়াশা না মেঘÑ এই নিয়ে আবার বিতর্ক শুরু হবে-হবে করছে, এমন সময় সত্যি সত্যি চারিদিক ঘন সাদা মেঘ অথবা কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। এক হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না।

সাদা রঙের প্রচ- উজ্জ্বলতায় আমাদের প্রত্যেকের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। আমাদের ভাঙা বাসের বুড়োমানুষ ড্রাইভার পর্যন্ত মুখ দিয়ে ‘ধুর’ জাতীয় বিরক্তিসূচক শব্দ করে গাড়ি ব্রেক করিয়ে ফেললেন।

আমরা বাসভর্তি লোকজন পরম মুগ্ধতা নিয়ে মুখ দিয়ে ‘আহা’, ‘ওহ্্’, ‘ওয়াও’, ‘ও মাই গড’ শব্দ করছি, যাদের হাতের কাছে ক্যামেরা ছিল তারা ক্লিক ক্লিক করে পাগলের মতো ছবি তুলতে শুরু করেছে। এ রকম হোয়াইট আউটের মাঝখানে ছবি তুললে সাদা দেয়ালের মতো ফ্যাকাশে এক ধরনের ছবি ওঠার কথা।

কিন্তু চোখের সামনে ভালো কিছু দেখলেই ক্যামেরা তুলে ছবি তুলে ফেলার নিয়ম, লোকজন তাই করছে।

কিন্তু এই ছবি পরে লোকজনকে নিয়ে দেখালে, তারা বিশ্বাসই করবে না। তারা বলবে, গল্প ছাড়ার আর জায়গা পাওনি? ছবি কোনো কারণে জ্বলে গিয়েছে। আর তোমরা বলছ, হোয়াইট আউট! যাও ভাগো!

এই সময় সবাইকে বিস্ময়ে পাথর বানিয়ে দিয়ে আরেকটা ঘটনা ঘটল।

ঠাস করে সাদা মেঘ (সন্দেহবাদীদের ভাষায় ‘কুয়াশা’) সরে গিয়ে চারিদিক ঝকঝকে পরিষ্কার হয়ে গেল। সেই পরিষ্কার ছবিতে আমরা দেখলাম, আমাদের বাসটা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশেই গভীর একটা খাদ। খাদের আরেক পাশে সবুজ আর ধূসর রঙের বিশাল একটা পাহাড়। সেই পাহাড়ের গা বেয়ে অঝোর ধারায় নামছে ঝরনা। একটা-দুটা না, একসঙ্গে অনেকগুলো ধারা।

আমাদের মাঝে যারা ঘরের বাইরে খুব বেশি যায়নি, তারা তো বটেই; যারা পৃথিবীর অনেকগুলো দেশও এরই মাঝে ঘুরে শেষ করে ফেলেছে, তারাও দুই-তিনটা বাক্যে স্বীকার করল, এমন সুন্দর দৃশ্য তারা এর আগে কোনোদিন দেখেনি। ভবিষ্যতেও দেখতে পাওয়ার সৌভাগ্য হবে, এমন সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

কাউকে কিছু বলে দিতে হলো না।

সবাই লাফ দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াতে লাগল। ভাগ্যিস মাঝখানে একটা বড় আকৃতির খাদ ছিল, নইলে সবাই গিয়ে সেই ঝরনায় ওঠার চেষ্টা করতে থাকত।

আমাদের বুড়োমানুষ ড্রাইভার সাহেবই আমাদের গাইড।

সে জানাল, এই ঝরনাটা এই অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত ঝরনা। এর নাম ‘সেভেন রিংস ফলস’। একসঙ্গে সাতটা ধারায় নেমে আসে বলে নাম দেওয়া হয়েছে সেভেন রিংস।

যদিও আমরা গুনে দেখলাম, কমপক্ষে কুড়িটা ধারা রয়েছে এই ঝরনায়। বুড়োমানুষ ড্রাইভারকে সেটা বলতেই, তিনি সেটা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘দেখতে ও রকমই মনে হয়। আসলে মূল ধারা সাতটাই। বাকিগুলো শাখা-প্রশাখা।’

আমরা যেখানটাতে থেমেছি, সেখানে কেউ সাধারণত থামে না। আরেকটু সামনে গিয়ে থামার জন্যে ভালো ব্যবস্থা আছে। সেখান থেকেই নাকি সেভেন রিংস ঝরনা খুব ভালোমতো দেখা যায়।

কিন্তু আমাদের লোকজন কেউই আরেকটু সামনে গিয়ে সেভেন রিংস ঝরনা আরও ভালোমতো দেখার জন্যে রাজি হলো না। এখান থেকেই নাকি ঝরনাটা সবচেয়ে ভালো করে দেখা যাচ্ছে।

একদল ঘোষণা করল, ‘আজ আর অন্য কোথাও গিয়ে কাজ নেই। সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত এখানেই কাটিয়ে দেওয়া গেলে, সেটা হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।’

আরেক দল বিজ্ঞের মতো (মুখ বাঁকিয়ে) বলল, ‘এ রকম ঝরনা এই অঞ্চলে শয়ে শয়ে আছে। একটার পেছনে এত সময় নষ্ট করা মোটেও উচিত হবে না।’

অন্য আরেকটা দল তাদের সমর্থন করে বলল, ‘হ্যাঁ, আমাদের এমনিতেই নানা কারণে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। হাতে সময় অনেক অল্প। আমাদের কাজ হবে, দ্রুত সবগুলো দেখে শেষ করে ফেলা।’

প্রথম দলের মাঝে এখনই উঠে পড়ার কোনো লক্ষণ ছিল না।

কিন্তু আমাদের গাড়িটা যেখানে থেমেছে, সেখানে আরও কিছু গাড়িও থামতে শুরু করেছে। এখানে সাধারণত কোনো গাড়ি থামে না, আমরা থেমেছি দেখে তারাও থেমেছে। শয়ে শয়ে মানুষ কিলবিল কিলবিল করে গাড়ি থেকে আসছে।

একটু আগেও যে জায়গাটা শান্ত-সমাহিত আর পবিত্র দেখাচ্ছিল, অল্প কিছুক্ষণের মাঝে সেটা রীতিমতো একটা হাট-বাজারে পরিণত হয়ে গেল।

কাজেই আমরা আর দেরি না করে, বাধ্য ছেলের মতো একে একে বাসে গিয়ে উঠে পড়লাম। বুড়োমানুষ ড্রাইভারটা আমাদের এভাবে দাঁড়িয়ে পড়াটা পছন্দ করেনি, সে এইবার মুখ দিয়ে একটা সন্তুষ্টিসূচক শব্দ করে গাড়ি স্টার্ট করে দিল।

সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা আরও কিছু দর্শনীয় এলাকা পরিদর্শন শেষ করে সন্ধ্যার কিছু পরে আবার হোটেলে ফিরে এলাম।

হোটেল-মালিক সুখদেব সিং আমাদের হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, ‘আপনাদের জন্যে দুইটা সুসংবাদ আছে। একটা দুঃসংবাদ আছে। কোনটা আগে বলব?’

সুন্দর সুন্দর জায়গা ঘুরে এসে সবার মাঝেই একটা চনমনে ভাব। সবাই হইহই করে উঠল, ‘সুসংবাদ আগে শুনি।’

সুখদেব সিং বললেন, ‘এক নম্বর সুসংবাদ হলো, আপনাদের যে পাঁচটা রুম গতকাল দেওয়া যায়নি, সেগুলো আজ দিয়ে দিতে পারব। শুধু তাই না, গতকাল বাধ্য হয়ে কয়েকটা খারাপ রুম দিতে হয়েছিল। আজ বেশিরভাগ রুম ফাঁকা হয়ে গেছে। আপনারা যেটা ইচ্ছা, সেটা বেছে নিতে নিতে পারেন।’

‘দুই নাম্বার সুসংবাদ? দুই নাম্বার সুসংবাদ?’

‘আপনারা যে ডলার ভাঙাতে দিয়েছিলেন, সেটা ভাঙানো হয়ে গিয়েছে। আপনাদের কেউ একজন টাকাগুলো বুঝে নিন।’

‘আর দুঃসংবাদ?’

‘আপনারা যেসব ডলার দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটা একশ ডলারের নোট ভাঙানো যায়নি। ওই নোটটা অনেক পুরনো। এখন আর চলে না।’

আমরা ‘ও আচ্ছা’ বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আমরা মনে করেছিলাম, না জানি কী দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। একটা একশ ডলারের নোট ভাঙানো যায়নি, এটা তো কোনো সমস্যা না। যার নোট, সে ফেরত নিয়ে গেলেই হবে।

কে জানি বলে উঠল, ‘কার নোট? কে দিয়েছিল?’

 

৪.

এইবার আমাদের সবার কাছে সমস্যাটার গভীরতা পরিষ্কার হলো।

যখন সবাই ডলার ভাঙাতে দিয়েছে, তখন তো আর ডলারের গায়ে কোনো চিহ্ন দিয়ে দেয়নি। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমরা বিদেশি ডলারের নোট ঘোড়ার ডিম সবাই খুব ভালো করে চিনিও না।

এখন ওই নোটটা কে দিয়েছে, সেটা কেমন করে বোঝা যাবে? সবাই তো ব্যাংক অথবা মানি এক্সচেঞ্জ থেকেই ডলার কিনেছে। কেনার সময় তো নিশ্চয়ই মাথায় ছিল না যে নোটটা অচল না সচল সেটা ভালোমতো বুঝে নিতে হবে।

আমাদের মধ্যে উদ্যোগী, তৎপর আর বিবেচক যারা, তারা গোল হয়ে জরুরি মিটিংয়ে বসলাম। যেহেতু বোঝার উপায় নেই, নোটটা কে দিয়েছিল কিংবা যে দিয়েছে, সে নিশ্চয়ই জেনে-বুঝে দেয়নি, কাজেই এই ক্ষতিটুকু সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

এর মধ্যে আরও একটা সমস্যা শনাক্ত হলো।

কেউ দিয়েছে একশ ডলারের নোট। কেউ দিয়েছে পঞ্চাশ ডলারের নোট। তাহলে যে ক্ষতিটুকু সবার মাঝে ভাগ করা হবে, পঞ্চাশ ডলারের নোটদাতাদের মধ্যে সেই ক্ষতি কোন হিসাবে ভাগ করা হবে?

আমাদের মাঝে যারা ব্যাংকার ছিল, তারা দ্রুত সমাধান দিয়ে দিল, ক্ষতির ইউনিটটা পঞ্চাশ ডলারের হিসাবে করতে হবে। যে পঞ্চাশ ডলার দিয়েছে, তাকে বহন করতে হবে এক ইউনিট ক্ষতি। যে একশ ডলার দিয়েছে, সে নেবে দুই ইউনিট ক্ষতি। অর্থাৎ ডলার ভাঙিয়ে যার যত রুপি পাওনা হয়েছে, সেখান থেকে তার একটা অথবা দুটো ইউনিট ক্ষতি বিয়োগ করে যেটা দাঁড়াবে, তাকে সেটা দেওয়া হবে।

এই সমাধান ঘোষণার পর, যারা পঞ্চাশ ডলার ভাঙাতে দিয়েছিল, তারা খুশিতে লাফাতে শুরু করে দিল। একেই বলে মিতব্যয়িতা। ভাগ্যিস তারা একশ ডলারের নোট দেয়নি! আর যারা একশ ডলার দিয়েছিল, তাদের চেহারা অন্ধকার হয়ে গেল। এত বড় ক্ষতির কারণে শপিংয়ের সময় নিশ্চয়ই তাদের অনেক কাটছাঁট করতে হবে!

আমাদের মধ্যে যারা ব্যাংকার, তারাই এই সমাধানের উদ্ভাবক। কাজেই হোটেল ম্যানেজারের কাছ থেকে একটা ক্যালকুলেটর চেয়ে এনে দ্রুত তিরিশজনের দেওয়া বিভিন্ন অঙ্কের ডলারের বিপরীতে প্রতি ইউনিটের পরিমাণ কত দাঁড়ায়, সেটা বিস্তর হিসাব-নিকাশের পর বের করে ফেলল।

তারপর দেখা দিল ভাঙতির সমস্যা। ব্যাংক থেকে একসঙ্গে পুরোটা হিসাব করে বড় বড় নোটে ভারতীয় রুপি বানিয়ে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের তো খুচরা পর্যায়ে বিতরণের সময় পাই-পয়সা হিসেব করে দিতে হবে।

আমাদের সমস্যার বিবরণ শুনে পরোপকারী হোটেল-মালিক সুখদেব সিং দুই হাজার রুপির ভাঙতি নোট পাঠিয়ে দিলেন।

একজন একজন লাইনে দাঁড় করিয়ে রুপি বুঝিয়ে দিয়ে সাইন করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সবার মধ্যেই ব্যাপক তাড়াহুড়ো। একটু পরেই দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাবে। রুপি হাতে পেলেই তারা শপিং করতে বেরিয়ে পড়বে।

দশ-বারোজনকে তাদের প্রাপ্য রুপি বুঝিয়ে দেওয়ার পর, একজন একটু আপত্তি করে বসলেন। রুপি হাতে নিয়ে কয়েকবার গুনে চোখে-মুখে একরাশ সন্দেহ নিয়ে তিনি বললেন, ‘রুপির ওজন একটু কম কম মনে হচ্ছে। আরও তো পাওয়ার কথা। ডলার আর রুপির এক্সচেঞ্জ রেট কমে গেছে নাকি?’

জটিল হিসাব-নিকাশ করে ইউনিট আর প্রাপ্য রুপির ভাগ-বাটোয়ারা করতে গিয়ে সমাধানকারী উদ্যোক্তা আর তৎপর ব্যক্তিদের মাথা গরম অবস্থায় ছিল। তারা একটু তেড়িয়া গলায় বলল, ‘হ্যাঁ রুপি একটু কমই আছে। একটু আগে সবাইকে ব্যাখ্যা করে বোঝানো হয়েছে। আপনি তখন ছিলেন না। সে জন্যে আপনি জানেন না।’

‘আমি কী জানি না?’

উদ্যোগীরা হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো ভঙ্গি করে বলল, ‘আমরা যেসব ডলার ভাঙতি করতে পাঠিয়েছিলাম, সেখান থেকে একটা একশ ডলারের নোট ফেরত এসেছে। সেটা নাকি অচল।’

যিনি আপত্তি করছিলেন, তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘একশ ডলারের নোটটা একটু দেখি।’

উদ্যোগী ও তৎপর বাহিনীর কাছ থেকে অচল নোটটা তিনি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে দেখলেন, তারপর ঘোষণা করলেন, ‘হুমম। এই নোটটা তো আমিই দিয়েছিলাম।’

উদ্যোগী নেতাদের মুখ ঝুলে গেল। ‘এই নোটটা আপনি দিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ, আমিই দিয়েছিলাম।’

‘তাহলে এতক্ষণ বলেননি কেন?’

‘বলার সুযোগ পেলাম কখন? আমার বন্ধুর একটা মানি এক্সচেঞ্জ আছে। সে এই নোটটা বাংলাদেশে চালাতে পারছিল না। তার কাছ থেকে আমিই নোটটা নিয়ে এসেছিলাম, দেখি বিদেশে চালানো যায় কিনা। এখন দেখা যাচ্ছে, চালানো যাচ্ছে না।’

ভদ্রলোক একটু কম কম ওজনের রুপিগুলো ফেরত দিয়ে অচল একশ ডলারের নোটটা নিয়ে চলে গেলেন।

অচল নোটটা কে দিয়েছিল, সেটা এতক্ষণ জানা যাচ্ছিল না, এভাবে হঠাৎ করে সেটা জেনে ফেলার কারণে একদল খুশিতে হইহই করে কয়েক পাক নাচানাচি শুরু করে দিল।

আরেক দলকে দেখা গেল চোখ-মুখ অন্ধকার বানিয়ে বসে আছে। এরা হলো সেই ব্যাংকার, যারা একটু আগে ক্যালকুলেটার চাপাচাপি করে অনেক কষ্টে হিসাব করে বের করেছে, কার ভাগে কত কম পড়বে। তাদের সেই কষ্টটা শেষ পর্যন্ত মাঠে মারা গেল।

এই দলটা হতাশ হয়ে উঠেই যাচ্ছিল, কিন্তু তাদের আবার নতুন করে হিসাব ঠিক করার জন্যে বসে পড়তে হলো। কারণ এরই মধ্যে কাউকে কাউকে প্রাপ্য রুপি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেটুকু কম পড়েছে, সেটা আবার নতুন করে তাদের ফেরত দিতে হবে। এখনো যারা পায়নি, তাদেরকে কত করে দিতে হবে, সেটাও নতুন হিসাব করে বের করা লাগবে।

জটিলতার শেষ নেই!

 

৫.

আমাদের সেই শিলং ট্যুরে শেষ পর্যন্ত নতুন করে আর কোনো ঝামেলা হয়নি।

পরবর্তী দুইদিন আমরা হইচই করতে করতে শিলং আর চেরাপুঞ্জির দর্শনীয় সব এলাকা দেখে শেষ করে ফেললাম।

চেরাপুঞ্জি বেড়াতে আসার প্রধান একটা কারণ ছিল, বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় যে জায়গায়, সেখানে বৃষ্টি কেমন করে হয়, সেটাও দেখে আসা। কিন্তু আমাদের কপাল খারাপ। আমরা যখন চেরাপুঞ্জি বেড়াতে গেলাম, তখন সেখানে শুকনো-খটখটে পরিবেশ। প্রখর রোদের কারণে ঠিকমতো খালি চোখে তাকিয়েই থাকা যাচ্ছে না।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীতে কয়েক বছর ধরে অনেক রকম আজব আজব ঘটনা ঘটছে, কেউ কেউ হয়তো এটাকে তার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করবেন।

যা খুশি হোক, আমরা সেবার প্রচুর মেঘ দেখেছিলাম। যেখানেই যাই, সাদা মেঘ এসে আমাদের ভিজিয়ে দিয়ে যায়। মেঘ না কুয়াশা, সেই বিতর্কও ততক্ষণে শেষ হয়ে গিয়েছে। কারণ কুয়াশা এসে কোনোদিন ভিজিয়ে দিয়ে যায় না। মেঘের পক্ষেই ভিজিয়ে দেওয়া সম্ভব।

বৃষ্টির বদলে সরাসরি মেঘের মধ্যে কাকভেজা ভিজতে পেরে একেকজন খুশিতে বাচ্চাদের মতো কী যে করল আর কী যে করল না, তা বলার নয়।

তবে সেটা অন্য কাহিনি। আরেক দিন বলা যাবে।

Scroll to Top