
ন-তে নওরোজ
নওরোজ ইমতিয়াজ
নাম নিয়ে আমার দুঃখ আর বিপদের শেষ নেই।
ছেলেবেলায় একটা ডাকনাম ছিল বটে, কিন্তু দীর্ঘ দিন সেই নাম ধরে কেউ ডাকে না বলে নিজেই ভুলে গিয়েছি। হঠাৎ করে কেউ ডেকে বসলে, চট করে সাড়া দিতে পারি না। মনেই থাকে না, ও রকম একটা নাম এককালে আমারই ছিল।
আমার ভালো নামের প্রথম অংশ, অর্থাৎ ‘নওরোজ’, এটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল করে দারোয়ান বা সিকিউরিটি গার্ডরা। কারও বাড়িতে বা অফিসে হয়তো দেখা করতে গিয়েছি। দারোয়ান বা সিকিউরিটি গার্ড সন্দেহযুক্ত দৃষ্টিতে আমাকে কয়েক দফা জরিপ করার পর জিজ্ঞেস করে, ‘আপনের নাম কী?’
আমি বলি, ‘নওরোজ।’
দারোয়ান বা সিকিউরিটি গার্ড চোখ কুঁচকে জানতে চায়, ‘কী নাম? নরশ?’
আমি বলি, ‘নরশ না। নওরোজ। ন, ও, র-য়ে ও-কার, বর্গীয় জ।’
দারোয়ান বা সিকিউরিটি গার্ড খুব বুঝতে পেরেছে ভঙ্গি করে ইন্টারকম তুলে বলতে থাকে, ‘স্যার/ম্যাডাম, আপনার কাছে নরেশ নামে একটা লোক আসছে।’ (আগে বলত একটা ছেলে আসছে, আজকাল চুল-দাড়ি পাকতে শুরু করেছে, আগের মতো বাচ্চা-ছেলেদের মতো দেখায় না, তাই হয়তো বলে ‘লোক’)।
শুধু ‘নরেশ’ বা ‘নরশ’ না, ‘নওরোজ’ শব্দটার আরও কিছু বিচিত্র উচ্চারণের সঙ্গে এই জীবনে পরিচয় হয়েছে। উদাহরণ : নুরুজ, নৌরজ, নৌরাজ, নরজ, নরাজ, নরেজ, নরেন, নিরাজ, নাউরুয, নেইরোজ প্রভৃতি।
বিশেষ করে বিদেশিরা কোনোদিন আমার নাম ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। তারা আমার নামের ইংরেজি বানান চেক করে দ্রুত সমাধানে পৌঁছে যায়।
তারা উচ্চারণ করে ‘নাউরোজ’।
আমার নামের ইংরেজি বানানটাও অবশ্য নানাবিধ বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট, ন্যাশনাল আইডি কার্ড, ভিজিটিং কার্ড, ফেসবুক, জিমেইল, ইয়াহু, হটমেইল, স্কাইপি-সহ বিভিন্ন জায়গায় আমি যে বানানটা ব্যবহার করি, সেটা হলো ঘধঁৎড়ু।
কিন্তু সবাই তো আর সেটা জানে না। কখনও আমার নাম লিখতে হলে, তারা তাদের সুবিধামতো লিখে নেয়। উদাহরণ : ঘড়ৎিড়ংব, ঘড়ৎিড়ু, ঘড়ৎিড়ল, ঘধৎিড়ু, ঘড়ঁৎড়ু, ঘড়ৎড়ু, ঘঁৎড়ু, ঘড়ৎড়ংব প্রভৃতি।
ছোটবেলা থেকে নাম নিয়ে এইসব গোলমাল দেখতে-দেখতে এখন গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। এখন নাম নিয়ে কেউ ভুল করলে আমি চোয়াল শক্ত করে তার দিকে তাকাই না।
কারও বাড়ি বা অফিসের দারোয়ান বা সিকিউরিটি গার্ড যদি নাম শুনে নিশ্চিত হওয়ার জন্য দ্বিতীয় বার প্রশ্ন করে জানতে চায়, আমার নাম ‘নরেশ’ অথবা ‘নরশ’ অথবা ‘নরেন’ কিনা, আমি জটিলতা এড়ানোর জন্যে তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে রাজি হয়ে যাই।
নতুন কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময় যখন আমি আমার নাম বলি, তাদের মধ্যে যারা মোটামুটি জ্ঞানী ও বিজ্ঞ, তারা বলেন, ‘নওরোজ শব্দের অর্থ নতুন দিন।’
সেই নতুন কারওদের মধ্যে যারা মহাজ্ঞানী ও মহাবিজ্ঞ, তারা বলেন, ‘নওরোজ হলো ইরানের জাতীয় উৎসব। ইরানিদের নববর্ষ তাদের সবচাইতে বড় ফেস্টিভাল।’
নতুন কারওদের মধ্যে যারা অত্যন্ত প-িত আর বিদ্বান, তারা প্রশ্ন করেন, ‘নওরোজ কিতাবিস্তান আর দৈনিক নওরোজ কি আপনার নাকি?’
আর নতুন কারওদের মধ্যে যারা সবচেয়ে কম জ্ঞানী ও কম বিজ্ঞ, তারা বলেন, ‘নওরোজ মানে কী? নও মানে না, আর রোজ মানে গোলাপ। মানে নও-গোলাপ। এইটা কারও নাম হইল? এই আজব নাম কে রেখেছে?’
নতুন আর পুরনোদের মধ্যে যারা একটু কবি-সাহিত্যিক প্রকৃতির, তারা ছড়া বানিয়ে বলেন, ‘নওরোজ নওরোজ, কত কথা কও রোজ।’
‘নওরোজ’ শব্দটার সঙ্গে যাদের খুব বেশি পরিচয় নেই; কী নামে ডাকবেন, সেটা নিয়ে অস্বস্তিতে পড়ে যান, তারা অবশ্য ডাকেন আমার নামের দ্বিতীয় অংশ ধরে, অর্থাৎ ‘ইমতিয়াজ’ অথবা ‘ইমতিয়াজ ভাই অথবা ‘ইমতিয়াজ স্যার’ (ইদানীং বয়স হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারি, ছোট-ছোট বাচ্চা মেয়েরা ‘ইমতিয়াজ আঙ্কেল’ও ডাকার চেষ্টা করে, আমি শুনতে পাইনি জাতীয় একটা ভঙ্গি করে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখি অথবা গভীর মনোযোগ দিয়ে মোবাইল টিপতে থাকি)।
নওরোজ নামধারী অন্য লোকজন ফেসবুকে মাঝেমধ্যেই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান, সঙ্গে ছোট্ট একটা ম্যাসেজ : ‘আপনি তো আমার মিতা, আসেন বন্ধু হই…’ অথবা ‘আমরা একই নামের মানুষ, আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করেন…’।
আমি যেহেতু সামনাসামনি যাদের চিনি না, তাদের বন্ধু হিসেবে ফেসবুকে গ্রহণ করতে অক্ষম, ফলে অচেনা-অজানা ‘নওরোজ’-দের অ্যাড করতে পারি না। ফলে কিছুদিন পরে তারা ক্রুদ্ধ হয়ে সর্বশেষ ম্যাসেজটা দেন : ‘নওরোজ নামের কেউ এত খারাপ আর অভদ্র হতে পারে, আপনাকে না দেখলে জানা হতো না…’।
…নাম বিষয়ক ত্যানা প্যাঁচানোর পর্ব এখানেই শেষ হলো।