
অপদার্থ ব্যক্তির বাজারসদাই
নওরোজ ইমতিয়াজ
বাজার-সদাই করার কাজে আমার অদক্ষতা, অপদার্থতা ও অজ্ঞানতা সীমাহীন পর্যায়ের।
আমার যখন অতি অল্প বয়স, তখনই বাসার লোকজনের কাছে এ বৈশিষ্ট্যটি ধরা পড়ে। ফলে অনেক দিন পর্যন্ত আমাকে বাজারে যেতে হয়নি।
বড় হওয়ার পর কয়েক দিন আগে সেই অভিজ্ঞতাও হয়ে গেল।
বাড়িতে কয়েকজন অতিথি আসবে। কাজেই স্ত্রী কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে সুদীর্ঘ ফর্দ হাতে অশেষ সাহসিকতার সঙ্গে বাজারের পথে রওনা হলাম।
বাড়ির কাছেই বিশাল দুটো বাজার হয়েছে। আধুনিক বাজার, মানে সুপার শপ। ভেতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কুলকুল ঠান্ডা পরিবেশ। কাচ দিয়ে ঘেরা ঝকঝকে-তকতকে ফ্লোর। অতিকায় শেলফে থরে-থরে জিনিসপত্র সাজানো। লুকানো স্পিকারে খুব মৃদুমন্দ আওয়াজে রবীন্দ্র সংগীত বেজে চলেছে।
সবচেয়ে বড় কথাÑ এই বাজারে যারা কাজ করেন, তারা অসম্ভব বিনয়ী, অমায়িক ও সহযোগিতাপ্রবণ। চোখাচোখি হওয়া মাত্র হাত তুলে বিনীত গলায় প্রথমে সালাম দেয়। তারপর মধুর গলায় জানতে চায়, কী খুঁজছি।
আমি তাদের সহায়তা নিয়ে অতি অল্প সময়ের মাঝে ফর্দ মিলিয়ে-মিলিয়ে জিনিসপত্র খুঁজে বের করে জড়ো করে ফেললাম। উদাহরণÑ
১. চামড়া ছাড়ানো মুরগি ৪টা
২. কাঁচামরিচ (পরিমাণ লেখা নাই)
৩. ক্যাপসিকাম (১ কেজি)
৪. আলু (২ কেজি)
৫. পটল (১ কেজি)
৬. ডিম (১ ডজন)
৭. শসা (১ কেজি)
৮. পাউরুটি (১টা বড়, মেয়াদ অবশ্যই দেখে নিতে হবে)
৯. হ্যান্ড-স্যানিটাইজার (১টা)
১০. শ্যাম্পু-কন্ডিশনার (সানসিল্ক, কোনো ডিসকাউন্ট বা অফার আছে কিনা, দেখতে হবে)
ফর্দে উল্লেখ ছিল না, কিন্তু পরে কাজে লাগতে পারে চিন্তা করে আরও কিছু অতি জরুরি জিনিসও কেনা হলো। উদাহরণÑ
১. মিক্সড জুস (এটা কিনে কুপন পূরণ করে বাক্সে জমা দিতে হয়, পরে লটারি হবে, লটারি জিতলে নাকি মালয়েশিয়া বেড়াতে নিয়ে যাবে)
২. বিশেষ ধরনের সাবান (এটাতেও লটারি হবে, জিতলে পাওয়া যাবে হিরার আংটি)
৩. সুগন্ধি নারকেল তেল (এর কাজ মাথা ঠান্ডা রাখা, সবচেয়ে জরুরি জিনিস, আমার স্ত্রী অত্যন্ত খুশি হওয়ার কথা)
৪. বাজারে নতুন আসা এক ধরনের আঠা (চেয়ার-টেবিলের কোনো অংশ খুলে গেলে এটা দিয়ে জোড়া লাগিয়ে ফেলা যায়)
৫. টিস্যু-বক্স
৬. ফয়েল পেপার
৭. কিচেন টিস্যু
৮. জিপারওয়ালা স্টোরেজ ব্যাগ (এই জিনিসও আমার স্ত্রীর কাছে এটি দারুণ সমাদৃত হওয়ার কথা)
৯. মাসালা চা, মশা ও তেলাপোকা মারার বিশেষ ধরনের স্প্রে (৭০% ডিসকাউন্ট)
১০. দুইটা কোন-আইসক্রিম (একটা কিনলে খারাপ দেখায়, তাই দুইটা) ইত্যাদি।
তালিকাভুক্ত পণ্যের মধ্যে কাঁচামরিচের অংশটা মনে হয় বিস্তারিত বলা দরকার।
আমি সেলসম্যানকে বললাম, ‘ভাই, কাঁচামরিচ দেন।’
‘কতটুকু দিব স্যার?’
কাঁচামরিচ কতটুকু নিলে ভালো দেখায়, সেটা আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল না। আমি একটু চিন্তা-ভাবনা করে বললাম, ‘দশ কেজি দেন।’
সেলসম্যান আমার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চোখ বড় বড় করে তাকাল। তারপর কোথা থেকে অতিকায় সাইজের একটা প্যাকেট নিয়ে এসে কাঁচামরিচ ভরতে শুরু করল।
আমি এর আগে কোনোদিন কোনো মানুষকে অতিকায় আকারের প্যাকেটের মধ্যে কাঁচামরিচ ভরতে দেখিনি। পুরো দৃশ্যটা আমার কাছে মনে হলো, কোদাল দিয়ে মাটি কোপানোর কর্মযজ্ঞের দৃশ্যের মতো।
আর দশ কেজি কাঁচামরিচ একসঙ্গে করা হলে সেটা যে এত বিপুল পরিমাণে হয়, সেটাও আমার জানা ছিল না। কাঁচামরিচ খুবই হালকা জিনিস, কিন্তু দশ কেজি কাঁচামরিচ একসঙ্গে প্যাকেট করার পর তা দেখতে ছোটখাটো একটা পাহাড়-টিলার মতো দেখাতে লাগল। সেটা দেখার পর আমি মনে মনে একটু ভড়কে গেলাম। এত বিপুল পরিমাণ কাঁচামরিচ দশ সদস্যের একটিট পরিবার পুরো বছর ধরে চেটেপুটে খেয়েও শেষ করতে পারবে না (তাদেও প্রত্যেকের যদি নিয়মিত তিনবেলা মুঠিমুঠি কাঁচামরিচ খাওয়ার অভ্যাস থেকে থাকে, তবুও), এমনকি নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে বিতরণ করেও শেষ করা কঠিন।
আমি আমার সন্দেহ মনের মধ্যে পুষে রাখলাম না। অবিলম্বে ফোন দিলাম বিজ্ঞ স্ত্রীকে। ‘আচ্ছা, কাঁচামরিচ কয় কেজি কিনব?’
সে টেলিফোনের ওইপাশে থেকে রাগী রাগী গলায় বলল, ‘কয় কেজি কিনবা মানে? কেজি না, একশ গ্রাম কিনবা।’
আমি থতমত খেয়ে বললাম, ‘মাত্র একশ গ্রাম? এরা কি শুধু একশ গ্রাম বেচতে রাজি হবে? আরেকটু বেশি কিনি?’
‘তোমার যা ইচ্ছা কিনতে থাকো। তোমারে আজকে কাঁচামরিচের ভর্তা আর স্যুপ বানায়ে দিব। খায়ো তুমি। আমি এখন ব্যস্ত, তোমার রঙঢঙ শোনার টাইম নাই।’
আমি ফোন রেখে সেলসম্যানের দিকে তাকিয়ে বিগলিত গলায় বললাম, ‘ভাই, দশ কেজি কিনতে মানা আছে। আপনি একশ গ্রাম… আচ্ছা না থাক… আড়াইশ গ্রাম দেন।’
আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম, সেলসম্যান গম্ভীর হয়ে বলবে, ‘আড়াইশ গ্রাম বেচি না।’ অথবা এতক্ষণ দশ কেজি কাঁচামরিচ প্যাকেট করতে বলে যে বেকুবি করেছি, সেই কারণে অনেক রাগারাগি করবে।
কিন্তু বাস্তবে সে রকম হলো না। সেলসম্যান ছোট্ট করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দশ কেজি কাঁচামরিচ আবার শেলফের যথাস্থানে ঢেলে দিয়ে ছোট আরেকটা প্যাকেট নিয়ে এসে দ্রুততার সঙ্গে আড়াইশ গ্রাম মেপে আমার হাতে ধরিয়ে দিল।
সব কিছু কেনাকাটার পর কাউন্টারে দাঁড়িয়ে বিল মিটিয়ে ফেরার সময় দেখি, সুপার শপের দারোয়ানটা পর্যন্ত অসম্ভব অমায়িক। আমাকে বাজারের ব্যাগ হাতে নিতেই দেয় না, একদম গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিল। পারলে বাসার গেটে এনে পৌঁছে দেয়।
আমি মনে মনে ছোটখাটো একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলামÑ বাজার করাটা আসলে জীবনের সহজসাধ্য কাজগুলোর অংশ। এখন থেকে অবশ্যই নিয়মিত বাজার করব।
কিন্তু বাসায় ফেরার পর, সেই ছোটখাটো সিদ্ধান্তে একটু গোলমাল ধরা পড়ল। আমার স্ত্রী সদাইপাতির সম্ভার দেখে ব্যাখ্যাতীত কী কারণে কেন জানি মেজাজ ও গলার স্বর সপ্তদশে তুলে ফেলল।
সে সময় তার উক্তিগুলো ছিল এ রকমÑ ‘আর যদি কোনোদিন তোমারে বাজারে পাঠাইসি!! …এইগুলা ঘোড়ার ডিম কী আনসো? …এইটা কী কিনসো? …এইটা কে কিনতে বলসে? ৃউফফ….!’
ঢিসাং… ঢিসুম… ঠাং… ঠং…. ঠুং… ঠাসঠাসঠাস… ধ্রিমাক…!
আমার আবারও বাজারে যাওয়া এবং নিয়মিত বাজার করার প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্যে অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।