অপরূপা (কিন্তু রাগী) ব্যাংক কর্মকর্তা

নওরোজ ইমতিয়াজ

যেসব সেবা কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা গ্রহণ করতে হয়, সেগুলোতে যাওয়ার দরকার পড়লে আমি এক ধরনের আতংক ও হতাশা অনুভব করি।

কোনো এক বিচিত্র কারণে আমাকে দেখামাত্র এইসব সেবা কেন্দ্রে যারা বসা থাকেন, তাদের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, চোখে-মুখে রাজ্যের বিরক্তি আর বিতৃষ্ণা এসে ভর করে।

আমি মানুষটা যেহেতু কিছুটা বেকুব ও নিরীহ প্রকৃতির এবং লোকসমাজে যেন সেটা কোনোভাবে ধরা পড়ে না যায়, সে জন্যে চেহারাটা সব সময় গম্ভীর বানিয়ে রাখি এবং গলার স্বর যতটা সম্ভব মোটা করে কথা বলি।

এই কৌশল কখনও কখনও কাজে দিলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাঠে মারা যায়।

সেবা কেন্দ্রে যারা বসা থাকেন, তাদের দিনরাত মানুষ চড়িয়ে খেতে হয়, কাজেই তারা একজন মানুষকে এক নজর দেখলেই তার পুরো বৃত্তান্ত মুখস্থ বলে দিতে পারেন।

আমাকে দেখামাত্র তারা বুঝে ফেলেনÑ এই ব্যাটা নেহায়েৎই গবেট ও গোবেচারা প্রকৃতির, এইটারে কিছুটা রগড় দেওয়া গেলে কোনো ক্ষতি নাই, বরং কিছুটা বিনোদন পাওয়া যেতে পারে।

এই সমস্ত কারণে আমি সেবা কেন্দ্রগুলোকে নাম দিয়েছি অনুগ্রহ কেন্দ্র। সেবাকর্মীরা সেখানে অনুগ্রহ করে মুখ তুলে তাকালেই কেবল সেবা পাওয়া সম্ভব।

আমি হয়তো একদিন ব্যাংকে গিয়েছি টাকা জমা দিতে।

শয়ে-শয়ে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে টাকা জমা দিচ্ছে অথবা টাকা তুলছে। আমিও সুবিধাজনক দেখে একটা লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। এক ঘণ্টার কাছাকাছি সময় পার হওয়ার পর যখন কাউন্টার পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগ হলো, আমাকে দেখেই অপরূপা সুন্দরী ক্যাশ অফিসারের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল। তিনি আমার কাগজপত্র দেখে বিরক্ত মুখে বললেন, ‘আপনি এই লাইনে দাঁড়িয়েছেন কী মনে করে? এটা তো ব্র্যাঞ্চের বাইরে এটিএম বুথে জমা দিবেন।’

আমার হয়তো তখন চেহারাটা হাসিখুশি বানিয়ে গলায় মধু ঢেলে বলা উচিত ছিল, ‘ভুল হয়ে গিয়েছে ম্যাডাম। এইবারের মতো নিয়া নেন।’

কিন্তু আমি যেহেতু বেকুব প্রকৃতির এবং সেটা যেন ধরে পড়ে না যায় সেই জন্যে চেহারা কৃত্রিমভাবে গম্ভীর বানিয়ে রাখি, সে জন্যে গলাটা যতখাানি সম্ভব মোটা বানিয়ে বললাম, ‘সেইটা তো এখন বললে হবে না। এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ তো বলে নাই এই টাকা বুথে জমা দিতে হবে।’

ফলাফল যা হবার তা-ই হলো।

অপরূপা ক্যাশ অফিসার ছ্যাঁৎ করে উঠলেন, ‘অশিক্ষিত নাকি! পড়ালেখা করেন নাই? দেখেন না ওইখানে বোর্ডে বড় বড় করে লেখা আছে, এইসব বিল বাইরে বুথে দিতে হবে! কাউন্টারে নেওয়া হয় না।’

আমি মেজাজ শান্ত রাখার চেষ্টা করতে করতে বললাম, ‘ঠিক আছে। আপনার কথা মানলাম। কিন্তু আমি যখন টাকা জমা দেওয়ার স্লিপ চাইলাম, তাহলে আপনার স্টাফরা এই স্লিপ আমাকে দিল কেন? তারা তো বলতে পারত, এখানে বিল নেওয়া হয় না।’

অপরূপা ক্যাশিয়ার এই পর্যায়ে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার ফরসা মুখ রাগে লাল-লাল দেখাচ্ছে।

তিনি চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন, ‘মোবারক! অ্যাই মোবারক! এদিকে আসো। এনারে ক্রেডিট কার্ডের বিল জমার স্লিপ কে দিয়েছে? তুমি দিয়েছ? তোমার এত্ত বড় সাহস! জানো না, কাউন্টারে বিল জমা হয় না? কী বুইঝা দিলা? এখন এনার বিল কে নিবে? তুমি নিবা?’

পরিস্থিতিটা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলার জন্যে এটাই ছিল সবচেয়ে মোক্ষম সুযোগ, শুধু তরল গলায় বললেই হতো, ‘ঠিক আছে। একটা ভুল বোঝাবুঝি যখন হয়েই গিয়েছে, এইবারের মতো বিলটা নিয়া নেন। নেক্সট টাইম বুথে দিব।’

কিন্তু আমি কী করলাম? আমি বললাম, ‘দেখলেন তো? পুরাটাই আপনাদের ব্যাংকের সমস্যা। এতক্ষণ বেহুদা আমার সঙ্গে চিল্লাপাল্লা করলেন।’

অপরূপা সুন্দরী ক্যাশ অফিসার আগুন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা মোটেও ব্যাংকের সমস্যা না। ব্যাংকের ছোট একটা অংশের সমস্যা। একটা ভুল হয়েছে। সে জন্যে আমরা স্যরি। কিন্তু আমি নিয়মের বাইরে কিছু করব না। আমার উপর নির্দেশ আছে, এই কাউন্টারে এই বিল জমা নিব না। আপনি চাইলে ম্যানেজার স্যারের সাথে কথা বলতে পারেন।’

আমি এতক্ষণে পুরো বিষয়টার মাঝে মূল বিপদ খুঁজে পেয়ে বললাম, ‘আপনি শুধু শুধু জেদ করছেন।’

অপরূপা মুখচোখ শক্ত করে বললেন, ‘আমি জেদ করছি না। যেটা নিয়ম, সেটা করছি।’

‘এতক্ষণ যত কথা হলো, ততক্ষণে আমার কাজটা কিন্তু হয়ে যেত।’

অপরূপা বোঝা যাচ্ছে আমার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। আমার পরের জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নেক্সট!’

আমার পরের জন মনে হয় এই সুযোগের অপেক্ষাতে ছিলেন। তিনি আমাকে কনুই দিয়ে ঠেলা দিলেন, ‘দেখি ভাই, সরেন। জায়গা দেন।’

আমি অসহায়ের মতো আশেপাশে তাকাচ্ছি। কেউ যদি আমার সমর্থনে এগিয়ে আসেন। কেউ এলো না। সবাই দেখা যাচ্ছে পুরো ব্যাপারটাতে বিশেষভাবে আনন্দিত, তাদের চোখেমুখে যে ভাষা ফুটে উঠেছে, সেটা সুন্দরমতো পড়ে ফেলা যাচ্ছেÑ যাক, আহাম্মকটার উচিত শিক্ষা হয়েছে!

Scroll to Top