একটি প্রস্তুতির গল্প

নওরোজ ইমতিয়াজ

আমি যে টেলিভিশন স্টেশনের জন্যে দীর্ঘদিন কাজ করতাম, সেখানে একবার পয়লা বৈশাখের আগে-আগে আমাকে ‘বৈশাখি আনন্দ মেলা’ ধরনের একটা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে মূল উপস্থাপকের সহযোগী হিসেবে কাজ করার জন্যে বলা হলো।

আমি মিনমিন করে দুর্বল গলায় বলার চেষ্টা করলাম, ‘আমি তো তোতলা, ভালো করে কথা বলতে পারি না। কী বলতে কী বলব…। আমাকে বাদ দিলে হয় না?’

ওপরমহল কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে যিনি আমাকে দায়িত্বটি দিতে চাইছিলেন, তিনি মেঘস্বরে ধমক দিয়ে বললেন, ‘বেশি কথা বলবা না। তোমাকে বেশি কিছু করতে হবে না। তোমার সাথে যে থাকবে, তুমি তার পাশে হাসি-হাসি মুখ করে বসে থাকবা। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করলে জবাব দিবা। …. আর শুনো, লাল-সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা চুড়িদার পায়জামা পরে আসবা। ঠিক আছে?’

আমি ‘ঠিক আছে’ ভঙ্গি করে মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গিয়ে গাল হাত দিয়ে বসে দুশ্চিন্তা করতে শুরু করলাম।

ছোটবেলা থেকেই আমার রসবোধের মাত্রা শূন্যের কাছাকাছি।

কেউ কৌতুক বা হাসির গল্প বলে শেষ করার পর আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি, চোখমুখ কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করি, এখানে হাসির অংশ কোনটা…।

আবার নিজে যখন কৌতুক বা হাসির গল্প বলার চেষ্টা করি, তখন অর্ধেক পর্যন্ত বলার পর আবিষ্কার করি, পরের অংশ ভুলে গিয়েছি। তখন মাথা চুলকে বিব্রত মুখে বলতে থাকি, ‘…ইয়ে, মানে…. কৌতুকটা না খুব হাসির। কিন্তু তার পরে যেন কী…. তার পরে যেন কী…। কৌতুকটা না খুব মজার…।’

উপস্থিত শ্রোতারা তখন হিহিহিহি করে হেসে ওঠে। আমি তখন বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে চিন্তা করতে থাকি, আমি তো কৌতুক শেষ করি নাই, এরা আগেই হাসছে কেন!

কাজেই বৈশাখি আনন্দ মেলা ধরনের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে আমার কী করা উচিত, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করে সময় নষ্ট না করে আমি আমার বন্ধু ও বাংলার কিংবদন্তী কৌতুক-স¤্রাট আশীফ এন্তাজ রবিকে ফোন দিলাম, ‘দোস্ত, বিরাট বিপদে পড়ে ফোন দিয়েছি। পয়লা বৈশাখ নিয়ে কী কী ফান আর মজা করা যায়, একটু আইডিয়া দে তো…।’

রবি অবাক হয়ে বলল, ‘তুই কি পয়লা বৈশাখের দিন টিভিতে প্রোগ্রাম-ট্রোগ্রাম করবি নাকি?’

আমি মিনমিন করে বললাম, ‘ইচ্ছা করে করতেসি না। জোর করে ধরায়া দিসে।’

রবি লম্বা একটা হাই তুলে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, ‘চিন্তা নিস না। আমার মাথায় বৈশাখি ফান গিজগিজ করতেসে। তোরে আমি এক মিনিট পরে ফোন করে একশ এগারটা আইডিয়া দিচ্ছি। তুই কাগজ-কলম নিয়ে রেডি থাক।’

রবি ফোন রেখে দিল এবং পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা সে আর ফোন দিল না। আমি কাগজ-কলম নিয়ে রেডি হয়ে একের পর এক কল দিয়ে গেলেও সে ফোন রিসিভ করল না।

আমি তারপর ফোন দিলাম বাংলার আরেক কিংবদন্তী ফান-মাস্টার সিমু নাসেরকে। সে দীর্ঘদিন দেশের প্রথম সারির পত্রিকার একটা ফান ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিল। তার অনেক ফান মুখস্থ থাকার কথা।

‘সিমু, বৈশাখ নিয়ে কী কী ফান করা যায়, কও তো দেখি।’

সিমু উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করল, ‘ইলিশ নিয়া এই বৈশাখে বিরাট ফান চলতেসে। একদল বলতেসে, ইলিশ খায়ো না। আরেক দল বলতেসে, আমার ইলিশ আমি খাব, তাতে কার কী…।’

আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, ‘এখানে ফানের অংশটা কোথায়?’

সিমু বিরক্ত হয়ে বলল,‘দূও মিয়া! পুরাটাই তো ফান। আপনি এক কাজ করেন, ফেসবুক খুইলা নিউজ ফিড স্ক্রল করতে থাকেন, প্রচুর ফানের এলিমেন্ট পেয়ে যাবেন।’

কাজেই আমি ফোন দিলাম ফেসবুকে বাংলাদেশের এক নম্বর সেলিব্রেটি এবং বিশিষ্ট ব্যাংকার ফখরুল আবেদীন মিলনকে, ‘উস্তাদ, বৈশাখ নিয়ে একটা শো করতে বলসে। কিছু ফানি আইডিয়া দেন।’

মিলন ভাই হেসে বললেন, ‘আমি কোথা থেকে আইডিয়া দিব? তারচেয়ে দুই লাইন কবিতা লিখে এসএমএস করে দেই?’

‘দেন।’

মিলন ভাই ফোন রেখে দশ মিনিটের মধ্যে এসএমএস করে দুই লাইনের কবিতা পাঠিয়ে দিলেন। কবিতাটি এ রকম :

‘… আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে

বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে…’

 

আমি মিলন ভাইকে আবার ফোন দিলাম, ‘মিলন ভাই, এইটা তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা!’

মিলন ভাই বললেন, ‘হ্যাঁ। আমি তো রবি ঠাকুরের কবিতাটাই লিখে পাঠালাম। ফানি কবিতা না? নদীদখল হইতে হইতে এখন তো বর্ষাকালেও হাঁটুুপানি থাকে। বৈশাখ মাসে তো মরুভূমি। হা হা হা…। ফানি না ব্যাপারটা?’

আমাকে দ্রুত মাথা নেড়ে একমত হতে হলো, ব্যাপারটা অবশ্যই বিরাট ফানি।

আমি ফানিম্যানদের বাদ দিয়ে, যাদের সহযোগী হিসেবে আমার বৈশাখি আনন্দ মেলা ধরনের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান করার কথা, তাদের মতামত নেওয়ার চেষ্টা করলাম।

প্রথমে ফোন দিলাম চিফ প্রেজেন্টার সাবিনা মেহেদীকে, ‘সাবিনা আপু! সাবিনা আপু! বলেন দেখি ওইদিন প্রোগ্রামে আসলে কী কী হবে? মানে আমরা কী কী করতে পারি?’

সাবিনা মেহেদী নিশ্চয়ই অনেক জরুরি কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তিনি অনেক কষ্টে বিরক্তি চেপে শান্ত রেখে বললেন, ‘তুমি এত প্রেশার নিচ্ছ কেন? আমরা গান-টান গাইব, একটু হাসি-তামাশা করব। এতেই অনেক আনন্দ হবে, দেইখো….।’

আমি তারপর ফোন দিলাম জাঁদরেল প্রেজেন্টার আঁখি ভদ্রকে, ‘আপনি কী গান গাইবেন, ঠিক করসেন? আমরা কিন্তু গান-টান গাইব, একটু হাসি-তামাশা করব…।’

আঁখি শংকিত গলায় বলল,‘নওরোজ ভাই, আপনিও কি গান গাইবেন নাকি? তামাশাও করবেন?’

আমি বিগলিত কণ্ঠে বললাম, ‘হ্যাঁ। বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান না? একটু হাসি-তামাশা করা দরকার না?‘

আঁখি হালকা কঠিন গলায় বলল, ‘হাসি-তামাশা তো আর রিহার্সাল দিয়ে করার জিনিস না। তাৎক্ষণিকভাবে যেটা হবে, সেটা হয়ে যাবে। আগে থেকে ভেবে রেখে তো আর হাসি-তামাশা করা যায় না। তাই না?’

আমি দ্রুত একমত হয়ে গিয়ে ফোন রেখে দিয়ে কল দিলাম আরেক দুর্ধর্ষ প্রেজেন্টার ওয়াসিমা মতিন তাম্মিকে, ‘আচ্ছা, আপনি পয়লা বৈশাখের প্রোগ্রামে কী গান গাইবেন? এসো হে বৈশাখ?’

ওয়াসিমা ঝাঁঝাল গলায় বলল, ‘শুনেন, এসো হে বৈশাখ ছাড়াও বৈশাখের আরও অনেক গান আছে। আমরা সেগুলো গাইতে পারি।‘

আমি এতক্ষণে কিছুটা উৎসাহ পেয়ে বললাম, ‘তাই নাকি? ভেরি ইন্টারেস্টিং। কী কী গান আছে বলেন তো, একটু নোট করে নেই।‘

ওয়াসিমা এক নাগাড়ে বলে যেতে থাকল, ‘…বৈশাখের গানের তো অভাব নাই। যেমনÑ মেঘবিহীন খর বৈশাখে, আইল আইল আইল রে রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইল রে, কে দুরন্ত বাজাও, এসো হে সজল শ্যাম ঘন দেয়া….। আরও শুনবেন?’

আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম, ‘বাহ! হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই।’

‘… বৈশাখ নিয়ে কিছু ফোক গানও আছে। কলকল ছলছল নদী করে টলমল, নাইয়া ধীরে চালাও তরণী…।’

‘কলকল ছলছল নদী করে টলমল’ অথবা ‘নাইয়া ধীরে চালাও তরণী’ কেন বৈশাখের গান হতে যাবে, সেটা নিয়ে আমি তর্ক শুরু করে দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই ওয়াসিমা তার আরেকটা কল এসেছে উল্লেখ করে তাড়াতাড়ি ফোন রেখে দিল।

আমি ফোনাফুনি শেষ করে কম্পিউটার অন করে গুগলে ‘বৈশাখি কৌতুক’ লিখে সার্চ দিলাম। আমি যে পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ সংক্রান্ত কৌতুক খুঁজে বের করতে চাইছিলাম, গুগলের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তা ধরতে পারল না। সে বাংলা ভাষায় রচিত যাবতীয় ১৮+ কৌতুক এনে আমার সামনে হাজির করতে লাগল। আমি পরম আগ্রহে সেইসব কৌতুক পাঠ করে হিহিহিহি করে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে লাগলাম।

যা হোক, সময় আর ¯্রােত কারও জন্যে অপেক্ষা না করে দ্রুত বয়ে গিয়ে যথাসময়ে পয়লা বৈশাখের সেই অনুষ্ঠানের মাহেন্দ্রক্ষণ চলে এলো।

আমি যথাসময়ে প্রকা- স্টুডিওর হাই-পারফরম্যান্স এয়ারকন্ডিশনারের হাঁড়-কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে ঢুকে টেনশনের চোটে কুলকুল করে ঘেমে-টেমে অস্থির হয়ে যাচ্ছি দেখে আমার মূল উপস্থাপক আমার পানে চেয়ে চেয়ে একটু পরপর হাসি দিয়ে আমাকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করলেন।

…তারপর কী হলো?

সেটা তো এখানে বলার দরকার নাই। আমি তো প্রস্তুতির গল্প বলতে বসেছিলাম। সেই গল্প শেষ।

Scroll to Top