জ্বর হলে বেশি কথা বলা বিপজ্জনক

নওরোজ ইমতিয়াজ

অনেক জ্বর হলে বেশি কথা বলা ঠিক না। এমনকি মোবাইল কল রিসিভ করা উচিত না। আমার একবার উথাল-পাতাল জ্বর হলো। তখন জ্বরের ঘোরে আমি নি¤œলিখিত কয়েকটি কুকীতির জন্যে দায়ী ছিলাম। সব ঘটনা বিস্তারিত আকারে এখানে বলে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তারপরও কিছু কিছু ঘটনা তো বলাই যায়।

 

১.

আমি যে ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকিং করি, সেখান থেকে একবার একজন সুকণ্ঠী কেউ আমার মোবাইল ফোনে কল করেছেন।

‘হ্যালো, মিস্টার ইমতিয়াজ বলছেন?’

‘জি। বলছি।’

‘স্যার, আমাদের সঙ্গে আপনার যে ক্রেডিট কার্ডটি আছে, সেটির মিনিমাম পেমেন্ট ডিউ হয়ে আছে।’

‘আমার ক্রেডিট কার্ড লেমন ডিউ হয়ে গেছে? শোনেন, এটা সম্ভব না। কার্ড হইল প্লাস্টিকের জিনিস, আর মাউন্টেন ডিউ তো লিকুইড। কীসের মধ্যে কী। হা হা হা।’

‘এক্সকিউজ মি স্যার, লেমন ডিউ না, পেমেন্ট ডিউ।’

‘ওহ। সেটাও তো হওয়ার কথা না। … ও আচ্ছা, মনে পড়েছে। গত মাসে তো আমি দেশের বাইরে ছিলাম। সে জন্যে দিতে পারি নাই। কিন্তু এখন আমি কেমন করে দিব?’

‘ও আচ্ছা স্যার। তাহলে আজকের মধ্যে দিয়ে দিন আপনার নিকটস্থ কোনো বুথে?’

‘আপনি কাছাকাছি না বলে নিকটস্থ বলছেন কেন? নিকটস্থ কেমন কঠিন কঠিন শোনায় না? তারচেয়ে দেখেন, কাছাকাছি কত চমৎকার একটা শব্দ। এই যেমন ধরেন, আপনি আপনার অফিসে, আমি আমার বাড়িতে কাঁথার তলায়। তারপরও এই মোবাইল ফোনের কারণে আমরা কত কাছাকাছি! …আহা! …দূরত্ব যতই হোক, কাছে থাকুন।’

‘ও মাই গড। স্যার, আপনি ড্রাঙ্ক! শিট!!’

‘এক অর্থে ড্রাঙ্ক বলতেই পারেন, একটু আগেই ঢক-ঢক করে মিক্সড ফ্রুট জুস ড্রিঙ্ক করলাম।’

ও-পাশে অবশ্য কোনো জবাব পাওয়া গেল না। সুকণ্ঠী ফোন রেখে দিয়েছে।

 

২.

অফিস থেকে সবচেয়ে বড় বস ফোন করেছেন।

‘কী ব্যাপার নওরোজ! তুমি দেশে ফিরে একটা খবর পর্যন্ত দিলা না। কী সমস্যা?’

‘স্যরি বস। আসলে দেশে ফিরেই জ্বরে পড়ে গিয়েছিলাম। কোনো সেন্স ছিল না।’

‘হায় হায়। বলো কী! একটু জানাবা না? অফিসের সবার জন্যে হেলথ ইনস্যুরেন্স করানো আছে। এখন কী অবস্থা?’

‘এখন একদম ফিট। কোনো জ্বর নাই। তারপরও ডাক্তার বলেছে কমপ্লিট বেড রেস্টে থাকতে। তাই রেস্ট নিতেছি।‘ (একটু আগে অবশ্য বউ এসে থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মেপে দিয়ে গিয়েছে, কাঁটায় কাঁটায় ১০৩ ডিগ্রি)

‘যাক খুব ভালো। খুব ভালো। তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো। …আর শোনো, তোমাকে একটা দরকারে ফোন করেছি। হাতের কাছে কাগজ-কলম আছে? তাহলে একটু লিখে নাও। আছে কাগজ-কলম?’

গত সাত দিনের মধ্যে একবারও নিজে নিজে গ্লাসে করে পানিও খেতে পারি নাই। কলম ধরব কেমন করে। সেটা তো আর বসকে বলা যায়। কাজেই চিঁ-চিঁ করে বললাম, ‘জি। কাগজ-কলম রেডি আছে। বলেন।’

অফিসের বড় বস টানা তিন মিনিট একটানা কথা বলে গেলেন। তারপর নিজেই হাঁপিয়ে গেলেন।

তারপর একটু দম নিয়ে বললেন, ‘আমি তো অনেক তাড়াতাড়ি বলে গেলাম, তোমার লিখতে অসুবিধা হয় নাই তো?’

এ-পাশে কোনো জবাব নেই।

‘হ্যালো? … নওরোজ, শুনতে পাচ্ছ? … হ্যালো। আরে, কী হলো ছেলেটার? অ্যাই, শুনতে পাচ্ছ আমার কথা? …. হ্যালো, নওরোজ…?’

অফিসের সবচেয়ে বড় বসের নির্দেশে আমার খোঁজখবর নিতে আধঘণ্টার মধ্যে মাঝারি পর্যায়ের দুজন বস চলে এলেন বাড়িতে।

আমি বিছানায় নরম লেপ-কাঁথার গভীরে আরাম করে ঘুমাচ্ছি দেখে তারা নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে গেলেন।

 

৩.

বহু দিনের পুরনো বন্ধু মহিদুল আহমেদ ফোন করেছেন।

‘আরে মিয়া, আপনেরে তো বাত্তি জ্বালাইয়া খুঁজতেছি।’

‘ক্যান ভাই, আমি কী করসি?’

‘না, কিছু করেন নাই। একটা হেলপ চাই।’

‘কী হেলপ?’

‘আমি একটা গান গাইসি। মানে সত্যিকারের গান। একদম ইনস্ট্রুমেন্ট বাজায়া। স্টুডিওতে গিয়ে ভয়েস দিসি।’

‘বাহ, ভালো তো। আপনি যে গান করেন, জানতাম না।’

‘নাহ, তেমন কিছু না। টুকটাক।’

‘তা, কী গান?’

‘কয়দিন আগেই তো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তারে নিয়া গান। গানের শিরোনাম : শুধু নেই সুনীল। সুনীলরে নিয়া তো একটা গান অ্যাটলিস্ট এই বাংলায় তৈরি হওয়া উচিত। ঠিক না? উনি তো দুই বাংলাতেই সমান জনপ্রিয় ছিলেন।’

‘তা তো বটেই। ভালো আইডিয়া। তবে সবার আগে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়া একটা গান করলে হইত না?’

‘সেটাই তো চাইসিলাম। কিন্তু ওই যে মৃদুল আহমেদ নামে একজন আছে না? চিনসেন তো? … সে অলরেডি একটা বানায়া ফেলছে। এর মধ্যে কবে জানি হুমায়ূন আহমেদের আবার জন্মদিন। সব রেডিও আর টেলিভিশনে নাকি সেই গান সারা দিন বাজবে।’

‘আপনিও বাজান।’

‘আরে, সেই জন্যেই তো আপনেরে ফোন দিলাম। রেডিও ফুর্তির অপু আছে না? অরে তো আপনি চিনেন? আপনি বলে দিলে সারা দিন বাজাবে না?’

‘অবশ্যই বাজাবে। কেন বাজাবে না?’

‘তাহলে একটু বলে দেন।’

‘হ্যাঁ, আমি অলরেডি বলে দিয়েছি।’

‘মানে? কখন কইলেন?’

‘এই তো, গত মাসে অথবা তার আগের মাসে।’

‘উস্তাদ! আপনি আমার লগে ফাইজলামি করতেসেন? না হয় ছোটভাই একখান আবদার নিয়া আসছিলাম। আপনেরা বড় মানুষ। বেবাগ লোকের লগে পরিচয়। তাই বইল্যা… হ্যালো? … ভাইজান, শুনতেসেন? … ও ভাই, রাইখ্যা দিলেন নাকি? …. হ্যালো….

 

৪.

আমার যেবার উথাল-পাতাল জ্বর হলো, তখন আমার উচিত ছিল মুখে স্কচটপ লাগিয়ে কথাবার্তা বন্ধ রাখা।

জ্বরের বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলে আমার সর্বজয়া এবং প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রীর বিজয় যখন আসন্ন, তখন সে আমাকে মোলায়েম গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘এখন কেমন লাগছে, বলো তো…।’

‘একদম ফ্রেশ। একটুও জ্বর নাই।’

‘হুমম, জ্বর নেমে গেছে। তোমাকে একটু চা করে দিব? চা খাবা?’

‘চা না, কফি দাও।’

‘কী কফি খেতে চাও?’

‘ক্যাপুচিনো।’

‘তোমার জন্যে বাড়িতে বসে আমি ক্যাপুচিনো কেমন করে বানাব? আচ্ছা, দাঁড়াও দেখি। …সেদিন যে বাসার উল্টাদিকের কফিশপে যে কফিটা খেয়েছিলাম, ওই রকম হলে চলবে?’

‘উঁহু, ওদের কফিটা বিচ্ছিরি। অজো ক্যাফের কফিটা মনে আছে? ওই রকম করে বানাও।’

‘অজো ক্যাফে? তুমি আর আমি তো কোনোদিন অজো ক্যাফেতে গিয়ে কফি খাইনি।’

‘খাইনি?’

‘না, খাইনি। কার সাথে গিয়েছিলে, বলো!’

‘কার সাথে যে গিয়েছিলাম! মনে পড়ছে না তো। একা একাই গিয়েছিলাম মনে হয়।’

(এই জায়গায় বুদ্ধি করে যে কোনো ছেলে বন্ধুর নাম বলে দিলেই ঝামেলা চুকে যেত। কিন্তু জ্বরের ঘোরে বিচারবুদ্ধি তো সব ঝাপসা)

‘তুমি একা একা অজো ক্যাফেতে গিয়ে কফি খেয়ে আসছ, সেটা আমারে বিশ^াস করতে বলো?’

‘না মানে…।’

‘সত্যি করে বলো। এই আমার মাথায় হাত রেখে বলো। মিথ্যা কথা বললে আমি এখনই মারা যাব। …বলো!’

‘তাহলে মাথা থেকে হাত সরিয়ে তারপর বলি? তুমি এখন হুট করে মরে গেলে আমার কী হবে?’

‘ঢং করবা না। বলো, কারে নিয়ে গেসিলা?’

‘আমার এক বন্ধুরে নিয়ে গেসিলাম।’

‘কোন বন্ধুরে নিয়ে গেসিলা?’

‘না মানে, …বন্ধুর বউ।‘

‘বন্ধুর বউ, না? কোন বন্ধুর বউ? তোমারে এখনই সব কথা খুলে বলতে হবে। বলো, আর কী কী করস? হাত ধরসো? একসাথে রিকশার হুড তুলে ঘুরসো? খুব ফুর্তি, না?’

‘হাত ধরতে যাব কেন? আজিব।’

‘ভ-ামি করার জায়গা পাও না? …তোমারে চিনি না মনে করসো? তুমি থাকো তোমার জ্বর নিয়া। আমি চললাম।’

‘আরে শোনো শোনে… ওইটা অনেক দিন আগের কথা। পাস্ট টেন্স। এখন আর আমি কারও সঙ্গে কফি খাইতে যাই না।’

‘যাও না মানে? ফেসবুকে দেখি, তোমার ছবিতে লাইক দেয়। তুমি তার ছবিতে লাইক দাও। তুমি এক্ষন তাকে ব্লক করবা। এক্ষন মানে এক্ষন। ’

‘আমি অলরেডি ব্লক করে দিসি তো…।’

‘তুমি আবার তারে কখন ব্লক মারলা? তুমি করসো না সে করসে?’

‘না, মানে, আমি ব্লক করতে গিয়ে দেখি, সে আগেই ব্লক করে রাখসে…।’

Scroll to Top