
নোম্যান্সল্যান্ড
নওরোজ ইমতিয়াজ
১.
রাজধানীর ফকিরাপুল বাস কাউন্টার থেকে আমাদের জন্যে হানিফ এন্টারপ্রাইজের রিজার্ভ করা বাসটা যখন ছাড়বে ছাড়বে করছে, ঠিক তখনই ট্যুর অপারেটরের মালিক আহমেদ হাসান সাহেব হাঁপাতে হাঁপাতে এসে আমার হাতে একটা মোটাসোটা খাম ধরিয়ে দিলেন।
‘এইটা রাখেন। আমার একজন লোক যাচ্ছে আপনাদের সাথে। সে তার মতো করে বর্ডার পার হওয়ার চেষ্টা করবে। কোনো কারণে বর্ডার পার হতে না পারলে, আপনি এই খামটা হোটেল অ্যামবাসির মালিককে দিবেন। এখানে আপনাদের রুম ভাড়া আর খাবারের পেমেন্ট দেওয়া আছে।’
আমি বিস্মিত হয়ে খামটা যতœ করে পকেটে রাখতে রাখতে বললাম, ‘ঠিক আছে, সেটা না হয় দিব। কিন্তু আপনার লোক বর্ডার পার হতে চেষ্টা করবে, মানে কী?’
‘সে আপনাদের গাইড। কিন্তু ভিসা পায় নাই। সে চেষ্টা করবে ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে বর্ডার পার হয়ে যেতে।’
‘মাই গড! বলেন কী? কোনো কারণে ধরা পড়ে গেলে?’
‘ধরা পড়ে গেলে, যাবে। আবার ছুটে বের হয়েও আসবে। সেইটা তার চিন্তা। আপনারা আপনাদের মতো বর্ডার পার হয়ে যাবেন। আপনারা তো তাকে চিনেন না। মানে আপনি চিনেন, আপনাদের দলের আর তো কেউ চিনে না।’
‘এই ব্যাপারটা আমার ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। আমাদের তো গাইড দরকার নাই। তারে নেওয়ার দরকার কী?’
‘সে থাকল আপনাদের সাথে। রাস্তাঘাট চিনে আসল।’
‘রাস্তাঘাট চিনে আসল মানে? সে না গাইড?’
‘তা ঠিক। কিন্তু সে আগে কোনোদিন শিলং যায় নাই। এইবারই প্রথম। অনেকবার দার্জিলিং গেছে। শিলং যায় নাই।’
‘কোনো দিন শিলং যায় নাই, এ রকম একজন মানুষকে আপনি গাইড হিসেবে সাথে দিচ্ছেন?’
আহমেদ হাসান মাথা চুলকে বললেন, ‘সেইটা অবশ্য একটা কথা। তবে এ রকম একটা মানুষ সাথে থাকলে তো সুবিধা। ফুটফরমাশ খাটল।’
‘আমাদের ফুটফরমাশ খাটার জন্যে কোনো লোক দরকার নাই। তারে বাদ দেন। বর্ডারে গিয়া বাই এনি চান্স, সে ধরা পড়ে গেল। তারপর একটা ভেজাল।’
‘আচ্ছা, আপনারে কোনো টেনশন নিতে হবে না। তারে বলে দিতেছি, সে আপনাদের সামনেই আসবে না। আপনারা টেনশনমুক্ত হয়ে রওনা করেন।’
আমরা আহমেদ হাসানের কথামতো টেনশনমুক্ত হয়ে রওনা দিলাম। রাত ১০টার হানিফ এন্টারপ্রাইজ আমাদের সিলেট শহরে পৌঁছে দিল ভোর ৪টার দিকে। শহরের বাইরে ছোট্ট একটা কাউন্টার। নারী ও শিশুদের সেখানে বসতে দেওয়া হলো। ছেলেদের কারও জায়গা হলো না, তারা বাইরে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা সিগারেট খেতে খেতে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক, ক্রীড়া ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করতে লাগল।
২.
ভোর ছয়টার দিকে একটা মুড়ির টিন আকৃতির বাস আমাদের তুলে নিয়ে তামাবিল সীমান্তের দিকে রওনা হলো। সব কিছু ঠিক থাকলে সকাল সাতটার মধ্যে আমাদের সীমান্তে পৌঁছানোর কথা। তামাবিল সীমান্ত দিয়ে খুব বেশি মানুষ যাওয়া-আসা করে না। এক ঘণ্টার মধ্যে দুই সীমান্তে ইমিগ্রেশনের কাজকর্ম শেষ করে ফেলা যাবে।
হোটেল অ্যামবাসির মালিক আমাদের জন্যে চারটা টাটা সুমো জিপ পাঠিয়ে রাখবেন বলে জানিয়েছেন। দুপুরে হোটেলের নিজস্ব রেস্তোরাঁয় খেয়ে-দেয়ে আমরা শিলং শহর ঘুরে দেখতে বের হবো। এ ছাড়া আগামীকাল যাব চেরাপুঞ্জি, যেখানে গোটা পৃথিবীর মাঝে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
মুড়ির টিনে চড়ে রওনা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে কে একজন মনে করিয়ে দিল, আমাদের ট্রাভেল ট্যাক্সই তো দেওয়া হয়নি। সবাই হায়-হায় করে উঠল। ট্রাভেল ট্যাক্স না দিলে তো এইপারের কাস্টমস আমাদের ওইপাশে যেতেই দেবে না। আসলে দেরি করে ভিসা পাওয়ার কারণেই এই সমস্যা হয়েছে। আগে আগে ভিসা পেলে ঢাকা থেকেই ট্র্যাভেল ট্যাক্স দিয়ে আসা যেত।
অবশ্য সমাধানও আছে। তামাবিল সীমান্তের কয়েক কিলোমিটার আগে একটা বাজার এলাকায় সোনালী ব্যাংকের শাখা আছে। সেখানে ট্র্যাভেল ট্যাক্স নেওয়া হয়।
ভোর ছয়টা-সাতটার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো ব্যাংক খোলার কথা না। তারপরও সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা সোনালী ব্যাংকের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়লাম। অনেকক্ষণ নাড়ানাড়ি করার পর বিরক্ত মুখে একজন দারোয়ান চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে এলো। সে আমাদের বক্তব্য মনোযোগ দয়ে শুনল। তারপর যেদিকে দু-চোখ যায়, সেদিকে চলে যাওয়ার ভঙ্গিতে কোথায় জানি রওনা দিল।
পুরো ব্যাংকের দরজা হাট করে খোলা। আমাদের মধ্যে একজন-দুজনের ব্যাংক ডাকাতির পূর্ব-অভিজ্ঞতা থাকলে এবং কয়েক রাউন্ড গুলিসহ বন্দুক-পিস্তল থাকলে, কিংবা ব্যাংকের টাকা-পয়সা রাখার ভল্টটা কোথায় অবস্থিত, সেই তথ্য জানা থাকলে, এই সুযোগে হয়তো আস্ত ব্যাংকটাই ডাকাতি করে ফেলা যেত। তাতে শুধু শিলং না, ভবিষ্যতে ইউরোপ-আমেরিকা বেড়াতে যাওয়ার খরচটাও হয়তো ভালোমতো উঠতে আসত।
কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই যেহেতু খাঁটি ভদ্রলোক এবং আমাদের কারুরই আগে থেকে অপরাধমূলক কাজকর্ম করার অভিজ্ঞতা নেই, কাজেই ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা বাদ দিয়ে যথাযথ ধৈর্য্য সহকারে অপেক্ষা করতে লাগলাম। খানিক বাদেই লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরা এক ভদ্রলোক ঘুম-ঘুম চোখে ছুটে এলেন। জানা গেল, তিনি এই ব্যাংকের ক্যাশিয়ার। তার বাড়ি ব্যাংকের পাশেই। দারোয়ান তার বাড়িতে গিয়ে তাকে ডেকে তুলেছে।
পুরো ব্যাপারটা ঢাকা শহরে ঘটলে, দারোয়ান আমাদের প্রথমেই হাঁকিয়ে দিত। বলত, ব্যাংক দশটায় খুলবে। তখন আসেন। অথবা ক্যাশিয়ার সাহেব নিজে ছুটে আসতেন না, পুলিশ পাঠাতেন। কিন্তু অজপাড়াগাঁ টাইপের এলাকা বলে ক্যাশিয়ার সাহেব তৎক্ষণাৎ ব্যস্ত হয়ে গেলেন। কোথায় বসতে দেবেন, কী খাওয়াবেন। এত সকালে তো চা-নাশতাও পাওয়া মুশকিল। আমরা এত দূর থেকে এসেছি, হাত-মুখ ধোয়ারও ব্যবস্থা করা দরকার।
আমরা অভিভূত হয়ে খেয়াল করলাম, কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব আয়োজন সুসম্পন্ন হয়ে গেল। ব্যাংকের আশেপাশের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ভাগ ভাগ করে আমাদের তিরিশ জনের দলটির হাত-মুখ ধোয়া ও বড় বাথরুম বা ছোট বাথরুম করার ব্যবস্থা করা হলো।
ক্যাশিয়ার সাহেব এরই মধ্যে টুক করে বাসায় গিয়ে লুঙ্গি ও স্যান্ডো গেঞ্জি বদলিয়ে প্যান্ট-শার্ট আর জুতা পরে এসেছেন। আমরা বিস্মিত হয়ে তার কর্মকা- দেখছি। মফস্বলের ছোট্ট ব্যাংকটার মধ্যে একসঙ্গে তিরিশজন মানুষের বসার ব্যবস্থা নেই। কিন্তু পাশেই একটা স্কুল রয়েছে, সেখান থেকে স্যাররা যেই চেয়ারে বসেন, সেগুলো চলে এলো। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা গেল, আমরা প্রত্যেকে সেই চেয়ারগুলোতে আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছি।
এর মধ্যে কোথা থেকে গরম গরম চা এবং টোস্ট বিস্কুটও চলে এসেছে। সঙ্গে বিচিত্র স্বাদের এক ধরনের পিঠা। এই এলাকায় কোক-ফান্টা পাওয়া যায় না বলে ক্যাশিয়ার সাহেব একটু পরপর মাথা নেড়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলেন।
আমরা সবাই চেয়ারে বসে গরম গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে ক্যাশিয়ার সাহেবের বক্তৃতা শুনছি। কেউ কেউ চা একটু বেশি গরম বলে পিরিচে ঢেলে ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করে চুকচুক করে খাচ্ছে।
তিরিশ জন মানুষের ট্রাভেল ট্যাক্স বুঝে নিয়ে রসিদ লিখে দেওয়ার কাজটা যথেষ্টই সময়সাপেক্ষ। আমাদের মধ্যে যারা একটু স্বেচ্ছাসেবী প্রকৃতির, তারা ক্যাশিয়ার সাহেবকে রসিদে নাম-ঠিকানা লিখে দেওয়ার কাজে সাহায্য করছে।
যাদের কাজ নেই, তারা গিয়েছে বাইরে রাস্তার ওপর ক্রিকেট খেলতে। এলাকার একদল বাচ্চা ছেলে ব্যাট-বল-স্ট্যাম্প নিয়ে ভোর বেলাতেই চলে এসেছে ক্রিকেট খেলতে। প্রতিপক্ষ হিসেবে একদল পূর্ণবয়স্ক মানুষকে হাতের কাছে পেয়ে তাদের আনন্দের সীমা নেই। রীতিমতো কয়েন দিয়ে টস করে ১৫ ওভারের ম্যাচই শুরু হয়ে গিয়েছে।
৩.
ব্যাংকের কাজ শেষ হতে হতে প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল। তখন মাত্র একটা দল ব্যাটিং শেষ করেছে। আরেক দলের ব্যাটিং চলছে। এই অবস্থায় তো চলে যাওয়া যায় না। মান-সম্মানের প্রশ্ন। স্থানীয় বাচ্চা ছেলেদের কাছে হেরে গেলে লোকে কী বলবে! অতএব ম্যাচ চলতে লাগল।
প্রচুর দর্শক সমাগম হয়েছে। এলাকার মানুষের কাছে এ ধরনের ক্রীড়া প্রদর্শনী বিরল ঘটনা। তারা হাততালি দিয়ে তাদের বাচ্চাদের উৎসাহ যোগাচ্ছে।
অন্যদিকে আমাদের দলের সমর্থকরা মূলত নারী ও শিশু। তারা কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে নিজেদের দলের ক্রিকেটারদের উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের ক্যাশিয়ার সাহেব তার কাজ শেষ করে আমাদের সমর্থক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। জিহাদি জোশ নিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছেন।
ক্রিকেট খেলা শেষ করে পুরস্কার বিতরণী, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ইত্যাদি শেষ করে আমাদের রওনা হতে হতে সাড়ে ৯টা বেজে গেল।
ম্যাচের ফলাফল কী হয়েছিল, আপাতত সেই প্রসঙ্গে আপাতত যাচ্ছি না। আসলে কোনো দল বাইরে কোথাও খেলতে গেলে, প্রথমে একটা-দুটো প্রাকটিস ম্যাচ খেলে কন্ডিশনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে নেয়। আমরা তো সেই সুযোগই পেলাম না।
তার ওপর লোকাল ক্রিকেটাররা হোম গ্রাউন্ডে খেলার বাড়তি সুবিধা পেয়েছে। এ ছাড়া সকালের শিশির-ভেজা উইকেটে প্রথমে ব্যাট করতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাও ভুল ছিল। আম্পায়ার হিসেবে স্থানীয় যে মানুষটাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সে যে আসলে বিশ্ব বাটপার প্রকৃতির, সেই ব্যাপারটাও প্রথমে বোঝা যায়নি।
তবে প্রথম ম্যাচের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী ম্যাচে আরও ভালো পারফরম্যান্স করতে হবে, এ বিষয়ে একমত হলো সবাই।
আমরা যখন ভ্রমণ শেষে আবার এই পথ দিয়ে যাব, তখন আরেকটা ম্যাচ হবেÑ স্থানীয় ছেলেপুলেদের সঙ্গে এ রকম একটা রফা করে আমরা তামাবিল বর্ডারের পথ ধরলাম।
চমৎকার রাস্তা। ডানপাশে উঁচু উঁচু সবুজ পাহাড়। একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, পাহাড়ের গা বেয়ে এখানে-ওখানে সাদা ফিতার মতো ঝরনা নেমে আসছে। অপূর্ব দৃশ্য।
আমাদের মন খারাপ হয়ে গেল, যখন জানা গেল, ওইসব পাহাড়ের সবগুলোই অন্য দেশে পড়েছে। একটাও আমাদের দেশের মধ্যে পড়েনি। অর্থাৎ ওই পাহাড়ে যেতে চাইলে ভিসা নিয়ে যেতে হবে।
এর মধ্যে কয়েকজন বলার চেষ্টা করল, ‘মন খারাপ করার কারণ নেই। আমাদের বান্দরবান-খাগড়াছড়ি-রাঙামাটিতেও এর চেয়ে সুন্দর সুন্দর পাহাড় আছে। কিন্তু কষ্ট করে হেঁটে হেঁটে উঠতে হয় বলে আমরা যাই না। এইসব পাহাড়ের চেয়ে আমাদের পাহাড়গুলো আরও বড়, আরও সুন্দর।’
আরেক দল বলার চেষ্টা করল, ‘আমরা শিলং-চেরাপুঞ্জির যেখানটাতে যাচ্ছি, সেখানেও অনেক বড় পাহাড় আছে। সবচেয়ে বড় কথা, সেই পাহাড়ে মেঘ নেমে আসে। চারিদিক সাদা হয়ে যায়। একে বলে হোয়াইট আউট। হোয়াইট আউট যখন হয়, তখন এক হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না।’
তখন অন্য দল বলল, ‘আরে, এ আর এমন কী? আমাদের দেশে যখন কুয়াশা হয়, তখনও এক হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না। দেখো না, শীতকালে প্রায়ই খবরের কাগজে লেখা হয়, ঘন কুয়াশায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ। মহাসড়কে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ। যাহা কুয়াশা, তাহাই মেঘ।’
এটা শুনে প্রথম দল মুখ বাঁকিয়ে বলতে লাগল, ‘ধুর! মেঘ আর কুয়াশা যদি একই হবে, তাহলে শিলং যাচ্ছি কেন? মেঘ অনেক ওপরে থাকে। উঁচু পাহাড়ে উঠলেই কেবল মেঘ ছোঁয়া যায়। আর মাটির কাছাকাছি যেটা থাকে, সেটা হলো কুয়াশা।’
মেঘ আর কুয়াশার মধ্যে আর কী কী পার্থক্য আছে কিংবা সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যাটা কী রকম, সেটা নিয়ে আরও বিস্তর বিতর্ক হতে পারত, যদি আমাদের পথ আরও দীর্ঘ হতো।
আমরা এরই মধ্যে তামাবিল সীমান্তের চেকপোস্টে পৌঁছে গেছি। চারিদিকে পাহাড় ঘেরা এক চিলতে সবুজ উপত্যকা, তার মাঝে ছোট ছোট কয়েকটা কাঠের ঘর। এগুলো হলো ইমিগ্রেশন, কাস্টমস আর বিডিআর অফিস। সব মিলিয়ে কেমন জানি মায়া মায়া চেহারা।
সেই মায়া মায়া চেহারাটাই আমাদের কাছে অতি নৃশংস হয়ে ধরা দিল।
পুরো উপত্যকা-জুড়ে হাজার হাজার মানুষ গিজগিজ করছে। ইমিগ্রেশন আর কাস্টমস অফিসের বাইরে দীর্ঘ লাইন। সবার হাতে পাসপোর্ট আর ইয়া বড় বড় লাগেজ। মনে হচ্ছে, সব ধর্ম-বর্ণ আর শ্রেণি-পেশা মিলিয়ে সর্বস্তরের মানুষ যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য আর উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে কোনো উৎসবে যোগ দিতে এসেছে।
৪.
আমাদের মধ্যে যারা উদ্যোগী আর তৎপর (মাসুদ পারভেজের নেতৃত্বে), তারা দ্রুত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ও বাস্তব ধারণা সংগ্রহ করে ফেলল। সেটা শুনে আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা।
নানাজনের কাছ থেকে শুনে আমাদের ধারণা হয়েছিল, তামাবিল চেকপোস্ট সাধারণত ফাঁকাই পড়ে থাকে। সারা দিনে বড়জোর কুড়ি-পঁচিশ জন মানুষ এপার-ওপার করে।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা হলো, কমপক্ষে দুই হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে। ঈদের ছুটি কাটাতে এরা সবাই শিলং-চেরাপুঞ্জি যাবে বলে বাসা থেকে রওনা হয়ে এতদূর পর্যন্ত এসেছে।
আমার কাছে তৎক্ষণাৎ পরিষ্কার হয়ে গেল, আমাদের ভিসা পেতে এত দেরি কেন হয়েছে। একসঙ্গে এত মানুষ ভিসার আবেদন করায়, হাইকমিশনের তো মাথা খারাপ হওয়ারই কথা।
তাও এই দুর্ভোগ কিছুটা কমতে পারত, যদি আমাদের ট্রাভেল ট্যাক্স ঢাকাতেই দিয়ে আসা যেত, অথবা যদি আমাদের এখানকার সোনালী ব্যাংকে সেটা জমা দেওয়ার জন্যে দেরি না হতো কিংবা যদি না ক্রিকেট খেলার জন্যে আমরা বেহুদা সময় নষ্ট না করতাম।
কিন্তু এখন তো সেগুলো নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই।
অতএব আমাদের মধ্যে উদ্যোগী আর তৎপর যারা, তারা দ্রুত সবার পাসপোর্ট জমা নিয়ে নিল। ইমিগ্রেশনের জন্যে যেসব কাগজপত্র পূরণ করতে হয়, সেগুলোও অশেষ দ্রুততার মধ্যে সম্পন্ন করা হলো। তারপর দুই-তিনজন স্বেচ্ছাসেবক জীবন বাজি রেখে ‘আল্লাহ আকবর’ বলে দুর্ভেদ্য ভিড় ভেদ করে ইমিগ্রেশন অফিসের মধ্যে ঢুকে গেল।
ঢোকার কাজটা মোটেও সহজ হলো না।
দুই হাজার মানুষের মধ্যে দেড় হাজারই প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে সেই অফিসের চারপাশে ভিড় করে আছে। নিজেদের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা জীবন থাকতে নতুন কাউকে ইমিগ্রেশন অফিসের কাছাকাছি আসতে দেবে না।
তার ওপর ইমিগ্রেশন অফিসের যে অফিসারের প্রতিদিন সময় কাটে জানালা দিয়ে সবুজ পাহাড়ের মনোরম শোভা দেখতে দেখতে এবং কুড়ি থেকে পঁচিশটা মানুষের ইমিগ্রেশন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে করতে; সেখানে তার টেবিলে ওপর দুই হাজার মানুষের পাসপোর্টের পাহাড় জমে গিয়েছে। আজ তার সবুজ পাহাড় দেখার কোনো সুযোগ নেই, সারাদিন পাসপোর্টের পাহাড় নাড়াচাড়া করেই সময় কাটাতে হবে। অবশ্য সবগুলো পাসপোর্টের রঙই সবুজ, এই যা মিল।
টেবিলের ওপর পাসপোর্টগুলো কয়েকটা কলামে সিরিয়াল অনুযায়ী রাখা ছিল। আগে জমা দেওয়া পাসপোর্ট আগে, পরে জমা দেওয়া পাসপোর্ট পরেÑ এই ভিত্তিতে একটা একটা করে পাসপোর্ট তুলে নিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসার সেগুলোতে সাইন করে দিচ্ছিলেন এবং যার পাসপোর্ট, তিনি সেটা বুঝে নিয়ে বিজয়ীর ভঙ্গিতে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন।
আমাদের তিরিশ জনের তিরিশটা পাসপোর্ট নিয়ে অকুতোভয় যে তিন স্বেচ্ছাসেবক বিস্তর ঠেলাঠেলি করে ইমিগ্রেশন অফিসে ঢুকতে সক্ষম হলেন, তারা সেগুলো টেবিলের ওপর রাখতে গিয়ে ছোট্ট একটা দুর্ঘটনা ঘটল।
তিরিশটা পাসপোর্টের ওজন মোটেও কম না, সেগুলো একটার ওপর একটা ঠিকমতো সাজিয়ে রাখাও সহজ কাজ না। তার ওপর টেবিলের ওপর যেগুলো আগে থেকেই সাজিয়ে রাখা ছিল, সেগুলো যে খুব সুন্দরমতো সোজা করে রাখা ছিল, তাও না। একটু তো বাঁকা-ত্যাড়া হয়েই থাকবে নিশ্চয়ই। আমাদের তিরিশ জনের পাসপোর্ট সেগুলোর ওপর রাখা মাত্র সেই কৃত্রিম পাহাড়ে ছোটখাটো ধস নামল। একটু আগেই যেগুলো সুন্দর করে সাজানো ছিল, মুহূর্তের মাঝে সেগুলো পরিণত হলো এলোমেলো স্তূপে।
ইমিগ্রেশন রুমের মধ্যে যারা আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন, তারা খুব খেয়াল করে নজর রাখছিলেন, পাসপোর্ট যে সিরিয়ালে জমা দেওয়া হয়েছে, সেই সিরিয়ালেই কাজ হচ্ছে কিনা কিংবা কেউ দুই নাম্বারি করে পরের পাসপোর্ট আগে সাইন করিয়ে নিচ্ছে কিনা।
পাসপোর্টের পাহাড় অকস্মাৎ ভেঙে পড়ায় পুরো প্রক্রিয়াটাই কেমন জানি এলোমেলো হয়ে গেল। যারা ভেতরে ছিলেন, সে সময় তাদের কী প্রতিক্রিয়া হলো, মুখের অভিব্যক্তি বা অঙ্গভঙ্গি বা ভাষাপ্রয়োগ বা অনুভূতি কেমন হলো, সেটা অবশ্য বাইরে থেকে কারও জানার সুযোগ হলো না।
আমরা যারা বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরে কী হচ্ছে সেটা জানার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, তারা অপার বিস্ময় নিয়ে প্রত্যক্ষ করলাম, কাঠের তৈরি পুরো ইমিগ্রেশন রুমটি বিপুলভাবে আন্দোলিত হচ্ছে। কখনো কাঁপছে, কখনো ওপরে উঠে যাচ্ছে, মাঝে মধ্যে ছোটখাটো লাফ পর্যন্ত দিচ্ছে।
টিভিতে যখন টম অ্যান্ড জেরির কার্টুন দেখায়, সেটা যারা না দেখেছে, তাদের আসলে পুরো দৃশ্যটা বুঝিয়ে বলা যাবে না। আমাদের মনে হতে লাগল, একসঙ্গে অনেকগুলো টম অ্যান্ড জেরিকে ওই রুমের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। টম আর জেরিরা একজোট হয়ে একদল আরেক দলের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া খেলছে।
পুরো বিপর্যয়টাই এত ভয়াবহ আর ব্যাপক যে, ভেতরে যারা ছিলেন তারা অধিক শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন দেখে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটল না।
আমাদের অকুতোভয় তিন সাহসী সৈনিক মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় হাসতে হাসতে বাইরে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হলেন। ভেতরে এত প্রচ- ভিড় ছিল যে, কাদের কারণে পাসপোর্টগুলো এলোমেলো হয়েছে, সেটা ঠিকমতো কেউ খেয়াল করে দেখতে পারেনি। কেউ একজন ভালোমতো চিনে রাখতে পারলে, এই তিনজনের আজকে রক্ষা ছিল না। শিলংয়ের বদলে আমাদের হয়তো অ্যাম্বুলেন্স ডেকে সিলেট ওসমানী জেনারেল হাসপাতালে ছুটতে হতো।
যাহোক, ঘণ্টাখানেক পর আমি সাহস করে ভেতরে ঢুকে দেখি, প্রাথমিক শোক কেটে গিয়েছে। বেশিরভাগ মানুষ হাল ছেড়ে দিয়ে বাইরে চলে গিয়েছেন দেখে ভিড়ও কিছুটা পাতলা।
পাসপোর্টগুলো যথারীতি এলোমেলো অবস্থাতেই আছে। ইমিগ্রেশন অফিসার একটা শেষ করে হাতের কাছে যেটা পাচ্ছেন, সেটার কাজ ধরছেন। প্রথম দিকে সবগুলো পাসপোর্ট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সাইন করছিলেন, এখন একেকটা হাতে নিচ্ছেন আর ভিসা খুঁজে বের করে খসখস করে সাইন করে দিচ্ছেন।
পাশে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী মানুষ সিল হাতে প্রস্তুত। সাইন করা শেষ হলেই, তারা সেটাতে সিল মেরে দিচ্ছেন। তারপর উঁচু গলায় যার পাসপোর্ট তার নাম ধরে ডাকছেন। পাওয়া গেলে ভালো, নাহলে আরেক পাশে সেগুলো সরিয়ে রাখা হচ্ছে।
পাসপোর্ট সাইন হয়ে গেলে সেগুলো নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একটু আগে সবার মধ্যে তাড়াহুড়া ছিল। এ মুহূর্তে কারও মধ্যে কোনো উৎসাহ নেই। কারণ বেশিরভাগই এসেছে দল বেঁধে। কেউ দশজনের দল, কেউ বিশ জনের, কেউ আমাদের মতো তিরিশ জনের। সবার পাসপোর্ট শুরুতে দল অনুযায়ী সিরিয়াল করা ছিল। এখন সব এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় কোনো সিরিয়াল নেই।
দেখা যাচ্ছে, দশজনের একটা গ্রুপের নয়জনের ইমিগ্রেশন শেষ, বাকি আরেকজনের পাসপোর্টই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কোন অতলে চাপা পড়েছে কে জানে। তারটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তো আর সীমান্ত পার হওয়া যাচ্ছে না। আবার একজনকে ফেলে রেখে চলে যাওয়াও তো ভালো দেখায় না।
আমি চোখের আন্দাজে বোঝার চেষ্টা করলাম, এখনও অন্তত দেড় হাজার পাসপোর্ট পড়ে আছে। একেকটা পাসপোর্টের কাজ শেষ করতে গড়ে এক মিনিট করে লাগছে। তার মানে সবগুলো পাসপোর্ট শেষ করতে অন্ত দেড় হাজার মিনিট। তার মানে ২৫ ঘণ্টা।
যদি এমন হয় যে, সবার শেষে আমাদের পাসপোর্টে সিল মারা হবে, তাহলেও আজকের মধ্যে পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আগামীকাল এই সময়েরও এক ঘণ্টা পর পাসপোর্ট পাওয়ার কথা।
এত দীর্ঘ সময় নিশ্চয়ই আমরা সীমান্তের খোলা ময়দানে অপেক্ষা করব না। কিন্তু পাসপোর্ট না নিয়েও তো চলে যাওয়া যায় না।
ইমিগ্রেশন রুমে যারা এখনও মাটি কামড়ে পড়ে আছে, তারা নিজেদের শরীরে এক বিন্দু রক্ত অবশিষ্ট থাকতে ওই পাসপোর্টগুলোতে হাত দিতে দেবে না। যদি বলি, ‘শিলং যাব না, আমার পাসপোর্ট ফেরত দেন. চলে যাই’, তাহলে তারা নিশ্চয়ই মাটি ছেড়ে আমাদেরই কামড়ে দিতে আসবে।
অতএব এখানেই থাকতে হবে।
আমি বাইরে এসে আমাদের দলের লোকজনের উদ্দেশে ঘোষণা করলাম, ‘বন্ধুরা, একটা সুসংবাদ আছে। একটু দুঃসংবাদ আছে। কোনটা আগে আগে বলব?’
আমার ধারণা ছিল, আমার এই কথায় সবাই হইহই করে উঠবে। কেউ বলবে, দুঃসংবাদ আগে শুনি। কেউ বলবে, আগে সুসংবাদটাই শোনা ভালো।
কিন্তু বাস্তবে সে রকম কিছু হলো না। আমার কথা শুনে সবাই কেমন জানি মিইয়ে গেল। ভাব করতে লাগল, এই উজবুকটা কোথা থেকে এসে এখানে ভাঁড়ামি শুরু করেছে!
আমি সবার মানসিক অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করলাম।
শিলং যাবে দেখে সবাই গতকাল সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়েছে। রাতে বাসে চড়ে আসার সময় বিস্তর হইচই আর গান-বাজনা হয়েছে, ঘুম হয়নি কারও। ভোরবেলা বাসের কাউন্টারে বসে থাকাটাও অনেক কষ্টের ছিল। সকালের মধ্যে সীমান্ত পার হয়ে দুপুরে মধ্যে শিলংয়ের হোটেলে পৌঁছে গোসল আর বাথরুম সেরে সবার রেস্ট নেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সেই দুপুরটা যে কড়কড়ে রোদের মধ্যে খোলা প্রান্তরেই কাটবে, সেটা এখন মোটামুটি নিশ্চিত। সকালে ঠিকমতো নাশতাও হয়নি। ব্যাংকের সামনে কিছু চায়ের দোকান ছিল। সেখান থেকে চা-বিস্কুট আর কলা খেয়ে নিয়েছে সবাই। মায়েরাও বুদ্ধি করে বাড়ি থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে নিয়ে আসা খাবার শিশুদের খাইয়ে দিয়েছে।
কিন্তু তা দিয়ে কতক্ষণ আর থাকা যায়। একমাত্র ভরসা ছিল, শিলং পৌঁছাতে পারলে খাওয়া-দাওয়ার অভাব হবে না। কিন্তু এই বিরানভূমিতে কোনো দোকানপাট বা হোটেল-রেস্তোরাঁও দেখা যাচ্ছে না।
আমি জুয়েলকে ডেকে পরামর্শ শুরু করলাম (জুয়েলও মহাউদ্যোগী ও মহাতৎপর একজন মানুষ, আকার-আকৃতি কিছুটা ছোটখাটো দেখে সবাই আড়ালে তাকে আগে ‘পিচ্চি জুয়েল’ বলত, এখন সে পরিবহনের ব্যবসা করে বলে, তার নাম হয়েছে ‘বাস জুয়েল’, কিন্তু জুয়েল নেহায়েৎই মহৎহৃদয় একজন মানুষ বলে তাতে কিছু মনে করে না)।
জুয়েলের সঙ্গে আমার আলাপচায়িতার বিষয়বস্তু হলো : তামাবিল সীমান্তে তো অনির্দিষ্টকাল কাটাতে হবে মনে হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার একটা ব্যবস্থা করা দরকার। আমাদের দলে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে। ছেলেরা না-হয় একটু বেশি কষ্ট করল, নারী ও শিশুদের তো আর এত কষ্ট দেওয়া ভালো দেখায় না।
জুয়েল কীভাবে কীভাবে জানি একটা অটোরিকশা ডেকে রওনা হয়ে গেল। আশেপাশে কোনো ভালো রেস্তোরাঁ নেই, তাকে যেতে হবে এখান থেকে দশ-পনের কিলোমিটার দূরের কোনো এক বাজারে। আধঘণ্টার পথ। আসতে-যেতে এক ঘণ্টা। আর খাবার রেডি করতে করতে নিশ্চয়ই এক ঘণ্টা। তার মানে দু-ঘণ্টার মধ্যে ফেরত চলে আসা যাবে। অর্থাৎ দুপুর আড়াইটা।
অবশ্য এর আগে পাসপোর্ট হাতে পাওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই।
শুরু হলো প্রতীক্ষা।
কেউ গাছতলায়, কেউ ইমিগ্রেশন বা কাস্টমস রুমের বারান্দায়, কেউ চায়ের দোকানে।
প্রথম দিকে সবার মাঝে যে হাসিখুশি ব্যাপারটা ছিল, একজন আরেকজনের সঙ্গে আনন্দিত মুখে গল্প করছিল, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিল পাশের জনের গায়ে, সব কিছুর মাঝেই হাসি-আনন্দ আর কৌতুকের উপকরণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল। এখন সবাই যে যার মতো জায়গায় বসে ঝিমাচ্ছে। কেউ কেউ তো সুবিধাজনক কিছু একটার গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়েই গিয়েছে।
তবে সবচেয়ে স্বস্তির ঘটনা হলো, এত ভোগিন্ত আর দুঃখ-কষ্টের মাঝেও কারও কোনো অভিযোগ নেই। চলমান দুর্ভোগের জন্যে কেউ কাউকে দায়ী করছে না। কেউ একজন অনুযোগ-অভিযোগ শুরু করলেই তার দেখাদেখি আরেকজন শুরু করত। এভাবে বাড়তেই থাকত। সে ক্ষেত্রে খুবই খারাপ ব্যাপার হতো।
একটু আগে কড়া রোদ উঠেছিল, গা চড়চড় করছিল। এখন আকাশে মেঘ করেছে, যেকোনো সময় বৃষ্টি নেমে যাবে। সত্যি সত্যি বৃষ্টি নামলে মহা কেলেঙ্কারি হবে। এতগুলো মানুষ, সেই অনুপাতে আশ্রয় নেওয়ার জায়গা নেই। প্রত্যেকেই মোটামুটি নির্ঘুম ও ক্ষুধার্ত। এর মধ্যে কারো বৃষ্টিতে ভেজার শখ থাকার কথা না।
কারও সঙ্গে যে একটু গল্পগুজব করব, সেই উপায়ও নেই। যার দিকে তাকাই, সেই দেখি কান্ত, অবসন্ন।
তবে আশেপাশের প্রকৃতি বড়ই মনোরম। প্রথমে সবাই ‘আহা’ বা ‘ওয়াও’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও, এ মুহূর্তে কারও মধ্যে মনোরম প্রাকৃতিক শোভা নিয়ে উৎসাহ নেই। আসার সময় যেসব সবুজ পাহাড় দেখে আমরা অভিভূত হয়ে যাচ্ছিলাম, সেসব পাহাড় এখন অনেক কাছাকাছি।
তবে পাহাড় যেখানে শুরু হয়েছে, তার ঠিক আগে আগেই আমাদের ভূখ- শেষ। মাঝখানে শুধু এক টুকরো নোম্যান্সল্যান্ড। আমাদের কেউ কেউ সেই নোম্যান্সল্যান্ডের সামনে দিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। নোম্যান্সল্যান্ডের বাংলা কী হবে? মানবশূন্য ভূখ-? নাকি নির্মানব ভূখ-? নেই-মানুষ ভূমি?
আমি আমার ঘুমন্ত (ঝিমন্ত বললেই উপযুক্ত হয়) স্ত্রীর পাশে গিয়ে বসলাম। সে একটা দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। তারও অনেক কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু সেটা কাউকে বুঝতে না দিয়ে যাদের আরও বেশি কষ্ট হচ্ছে তাদের পাশে গিয়ে এতক্ষণ গল্পগুজব করার চেষ্টা করছিল। শেষ পর্যন্ত মনে হয় হাল ছেড়ে দিয়ে এখানে এসে ঘুমাতে শুরু করেছে।
আমি নিজের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও ক্রোধ অনুভব করলাম।
ঘোড়ার ডিম এই ট্যুরের পরিকল্পনা করাই বিশাল আহাম্মকি হয়েছে। শুরু থেকেই আসলে বোঝা উচিত ছিল। যখন ভিসা হচ্ছিল না, তখন আসলে প্রকৃতি একটা সিগন্যাল পাঠিয়েছে, ওহে বেকুবের দল, তোমরা শিলং যাওয়ার চেষ্টা বাদ দিয়ে বরং বান্দরবান যাওয়ার চেষ্টা করো। সেটাই অধিকতর বুদ্ধিমানের কাজ। পাহাড় দেখতে চাও ভালো কথা, শিলং কেন যেতে হবে, বান্দরবানেও তো পাহাড় আছে।
আমরা নিরেট মুর্খ, তাই প্রকৃতির সিগন্যাল বুঝতে পারিনি।
যখন বুঝতে পেরেছি, তখন আর ফেরার রাস্তা নেই। এতদূর আসার পর কেউ নিশ্চয়ই এখন ফিরে যেতে রাজি হবে না। তার চেয়েও বড় কথা, ইমিগ্রেশন রুম থেকে এতগুলো পাসপোর্ট খুঁজে বের করে ফেরত নিয়ে আসার কাজটাও মনে হয় সহজ হবে না।
৫.
…ঘুম ভাঙার পর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় ঘণ্টা ঘুমিয়ে ফেলেছি। কীভাবে কীভাবে জানি পৌনে পাঁচটা বেজে গিয়েছে। সূর্যের আলো প্রায় নিভে গিয়েছে। চারিদিকে কেমন জানি একটা শূন্যতা, নিস্তব্ধতা আর গুমট বিষন্নতা।
ধড়মড় করে উঠে দেখি, চারপাশে সবাই ঘুমাচ্ছে। কেউ গাছতলায়, কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে, কেউ খোলা আকাশের নিচে।
আজব তো, ঘুমের দেশে এসে পড়লাম নাকি! অবশ্য কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে এদিক-ওদিক হাঁটাহাঁটি করছে। কেউ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
এই সময় দেখি, উদ্যোগী ও তৎপর কমিটির আহ্বায়ক মাসুদ পারভেজ তার সঙ্গীসাথিদের নিয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে।
এসেই সে গর্জন ছাড়ল, ‘অ্যাই, সবাই রেডি হন। আমাদের পাসপোর্ট রেডি হইয়া গেছে। একজন একজন করে নিয়া আসতে হবে। উঠেন সবাই, উঠেন।’
এতক্ষণ যাদের মনে হচ্ছিল নির্জীব-নিষ্প্রাণ আর ঘুমের দেশের মানুষ, মুহূর্তেই একেকজন লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। নারীরা তাদের বাচ্চা-কাচ্চা এবং পুরুষরা ভারী ভারী লাগেজ টানতে টানতে ইমিগ্রেশন রুমে গিয়ে যার যার পাসপোর্ট নিয়ে এলো। এরপর কাস্টমস আর বিডিআর থেকেও বিশেষ ঝামেলা হলো না।
আর দেরি করার মানে হয় না।
সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে একজন একজন করে নোম্যান্সল্যান্ড পার করানো হলো। তারপর দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হলো, একজন ওই পাশে ডাউকি চেকপোস্টে গিয়ে সবার পাসপোর্ট বুঝে নিয়ে সেখানকার ইমিগ্রেশনে জমা দেবে। একজন সবার লাগেজ একখানে জড়ো করে পাহারা দেবে।
সবাইকে ডাউকি চেকপোস্টে পার করে দিয়ে আমরা অবশিষ্ট দুয়েকজন যখন নোম্যান্সল্যান্ড পার হব বলে রওনা দিয়েছি, তখন দেখি দূর থেকে চিৎকার করতে করতে কে জানি ছুটে আসছে।
আরে, এ তো দেখি জুয়েল!
আশ্চর্য, জুয়েলের কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। এই মানুষটা তামাবিল সীমান্ত পর্যন্ত এসেছে আমাদের বিদায় দিতে। তিরিশ জনের পাসপোর্টের মধ্যে সে ছিল না বলে তার অনুপস্থিতিটা এতক্ষণ ধরা পড়েনি।
জুয়েলের হাতে তিরিশটা পলিথিনের ব্যাগ। সে যেখানে খাবার আনতে গিয়েছিল, সেখানে তিরিশ জনের খাবার রেডি ছিল না। সে নিজে সামনে বসে থেকে নির্দেশনা দিয়ে তিরিশ জনের খাবার রান্না করিয়েছে।
এইসব এলাকায় খাবার-দাবার প্যাকেটে করে বিক্রি হয় না। এ জন্যে জুয়েলকে তিরিশটা পলিথিনের ব্যাগ যোগাড় করে তার মধ্যে খাবার ভরে নিয়ে আসতে হয়েছে। একা হাতে এত কিছু করতে গিয়ে তার পক্ষে যথাসময়ে উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
আমরা জুয়েলকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিরিশটা পলিথিনের ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে বিডিআর ও বিএসএফ জওয়ানদের সন্দিগ্ন দৃষ্টির সামনে দিয়ে নোম্যান্সল্যান্ড পার হয়ে গেলাম।
আমাদের ধারণা ছিল, বাংলাদেশ অংশের ইমিগ্রেশনের লোকজন বুঝি লুথা আর অকর্মা। ওই পাশে গেলে কাজকর্ম অনেক তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, পাহাড় আর পাথরের মাঝে থাকতে থাকতে সেখানকার ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের হৃদয়টাও পাথরে পরিণত হয়ে গিয়েছে।
প্রথমত, তারা ঘোষণা করল, তাদের অফিস আওয়ার শেষ। এখন তারা বাড়ি যাবে।
দ্বিতীয়ত, একসঙ্গে এত টুরিস্টকে সেবা দেওয়ার মতো লজিস্টিক আর লোকবল তাদের নেই। এ বিষয়ে হেড অফিসে কথা বলে তারা সিদ্ধান্ত নেবে, কী করবে।
কী সিদ্ধান্ত হলো কে জানে, কিন্তু দেখা গেল একটা একটা করে পাসপোর্টে সিল দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। দুয়েকজনকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছেÑ তারা কোথায় যাবে, কেন যাবে, কেমন করে যাবে, কোথায় থাকবে।
এ ক্ষেত্রেও একটা সমস্যা দেখা দিল। শিলংয়ে যত হোটেল আছে, তাতে ঠাসাঠাসি করে খুব বেশি হলে চার-পাঁচশ মানুষ থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব। বাকিরা হোটেল বুকিং না দিয়েই চলে এসেছে। তারা কোথায় থাকবে?
আমাদের কপাল ভালো, আমরা হোটেল বুকিং দিয়ে এসেছি। আমাদের জন্যে চারটা গাড়িও এতক্ষণে চলে আসার কথা। সেই গাড়ি খুঁজতে গিয়ে দেখি, আমাদের দেরি দেখে চারটা গাড়িই অন্য যাত্রী নিয়ে শিলং ফেরত চলে গিয়েছে।
আমাদের মাথায় আবারও আকাশ ভেঙে পড়ল। ইমিগ্রেশনের কাজকর্ম যদি শেষও হয়, তাহলেও তো কোনো লাভ হচ্ছে না। আমরা শিলং যাব কেমন করে? একে তো পথঘাট চিনি না, তার ওপর রাত নামতে শুরু করেছে। অনেক দূরের পাহাড়ি পথ, এত মালপত্র আর বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে হেঁটেও তো যাওয়া সম্ভব না।
মোবাইল থেকে ফোন দিলাম হোটেল মালিককে।
‘আমরা বাংলাদেশ থেকে আসছি। আপনার হোটেলে আমরা পনেরটা কামরা বুকিং দিয়েছি। আপনার তো গাড়ি পাঠানোর কথা ছিল। সেই গাড়ি কোথায়?’
এই কথাগুলো মনে মনে বাংলা থেকে ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করে মাত্র বলতে শুরু করেছি, এই সময় হোটেল মালিক পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠলেন, ‘আরে, আমি তো আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা করছি। আপনাদের তো দুপুরে পৌঁছানোর কথা ছিল। আপনার লাঞ্চ রেডি করে রেখেছিলাম। সব তো ঠান্ডা হয়ে গেল। এগুলো এখন কে খাবে?’
আমি একটা ধাক্কার মতো খেলাম।
প্রথমত, এই লোক দেখি দিব্যি বাংলা বলতে পারে। এর সঙ্গে ইংরেজি বলার দরকার কী!
দ্বিতীয়ত, আমরা কেমন করে শিলং পৌঁছাব, সেটার ঠিক নাই, এই লোক আছে তার লাঞ্চ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সেই টেনশনে।
আমি গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বললাম, ‘হ্যাঁ। আজকে তো বর্ডারে তো অনেক প্রেশার। এই জন্যে দেরি হচ্ছে। আপনার তো চারটা গাড়ি পাঠানোর কথা ছিল। সেই গাড়িগুলো তো দেখি আমার ফেলে রেখেই চলে গিয়েছে।’
‘চলে তো যাবেই। ড্রাইভারদের সাথে কনট্যাক্ট ছিল, দুপুরের মধ্যে আপনাদের শিলং পৌঁছে দিয়ে তারা অন্য ট্রিপ ধরবে। এখন আপনারা দেরি করেছেন, তাই ওরা চলে গেছে।’
‘তাহলে আমরা শিলং পৌঁছাব কেমন করে?’
‘বড় পেরেশানিতে ফেললেন তো। এখন তো তাহলে নতুন করে গাড়ি ভাড়া করতে হবে। কিন্তু তাতে খরচা বেড়ে যাবে না? আপনাদের বাজেটে কি কুলাবে?’
‘কী আশ্চর্য! তাই বলে আমরা কি সারা রাত বর্ডারে দাঁড়িয়ে থাকব নাকি?’
‘হুমম। আচ্ছা দেখি কী করা যায়। আমাদের এখানে তো আবার রাত্তিরে গাড়িঘোড়া একদমই চলে না। অলরেডি তো রাত হয়ে গেছে। কঠিন পেরেশানির মধ্যে ফেললেন।’
আমি নরম গলায় বললাম, ‘আমরাও মহা পেরেশানির মধ্যে আছি মশাই। আমাদের সাথে অনেক বাচ্চা-কাচ্চা আর মহিলা আছে। তাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। আপনি কিছু একটা ব্যবস্থা করেন।’
ভদ্রলোক খুবই নিরাসক্ত গলায় ‘আচ্ছা, দেখি কী করা যায়’ বলে লাইন কেটে দিলেন। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা তাকে আর ফোনে পাওয়া গেল না। তার মোবাইলে কল করার চেষ্টা করতে করতে আমার মোবাইলের ব্যাটারির চার্জ স্তিমিত হয়ে এলো।
৬.
আমরা ওই সীমান্তের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস থেকে ছাড়া পেলাম রাত এগারটার কিছু আগে।
ততক্ষণে হোটেল মালিকের পাঠানো গাড়িগুলোও চলে এসেছে।
আমাদের তিরিশ জন মানুষ ও বিশাল বিশাল লাগেজের জন্যে চারটা টাটা সুমো জিপই অনেক অল্প হয়ে যায়। হোটেল মালিক নাকি অনেক কষ্টে তিনটা সুমো জিপের ড্রাইভারকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করিয়েছেন আমাদের নিয়ে আসার জন্যে। উপায় যেহেতু নেই, আমরাও অনেক কষ্টে সেগুলোর মধ্যে আমাদের তিরিশ জনকে সবার মালপত্র-সহ ঠাসাঠাসি করে আঁটিয়ে ফেলতে সক্ষম হলাম।
একেকটা গাড়িতে তিনটা করে সারি।
প্রথম সারিতে ড্রাইভার, তার ডানপাশে তার সহকারী (আমি কোনোদিন কোনো ড্রাইভারকে তার দুপাশেই যাত্রী নিয়ে গাড়ি চালাতে দেখিনি। পাহাড়ি রাস্তায় কীভাবে সে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঠিকমতো নিরাপদে গাড়ি চালাবে, সেই চিন্তা করে আমার গলা শুকিয়ে গেল)। ড্রাইভারের বামপাশে দুজন যাত্রী। পেছনের সারিতে চারজন চারজন করে।
টাটা সুমোর ছাদে মালপত্র নেওয়ার সুবিধা আছে। সেই সুবিধা নেওয়া গেল না। কারণ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমাদের মধ্যে কেউই নিজেদের মালপত্র অকাতরে বৃষ্টিতে ভিজতে দিতে রাজি হলো না।
আমি ও আমার স্ত্রী (এখনও ঝিমন্ত) একটা গাড়ির সামনের সারিতে ড্রাইভারের বামপাশে বসলাম।
প্রচ- কান্তিতে মাথা সোজা করে রাখা যাচ্ছে না। সিটের পেছনে হেডরেস্ট নামক একটা জিনিস থাকার কথা। সেটা নেই, কাজেই মাথাটা সেখানে হেলান দেওয়া যাচ্ছে না। আর এমন বেকায়দাভাবে বসেছি যে, বামপাশে আমার ঝিমন্ত স্ত্রীর কাঁধে হেলান দেব, সে উপায়ও নেই। ডানপাশে হেলান দেওয়া যায়, কিন্তু তাতে ড্রাইভারকে বিরক্ত করা হয়ে যাবে কিনা, বুঝতে পারছি না। তার ওপর সে তার ডানপাশে বসিয়েছে এক সহকারীকে।
আমাদের বহনকারী তিনটা গাড়িই একসঙ্গে চলতে শুরু করেছে। আঁকাবাকা এবং উঁচু-নিচু পাহাড়ি বিপজ্জনক রাস্তা। প্রচ- বৃষ্টি হচ্ছে, হেডলাইটের আলোয় সামনের পথ চকচক করছে।
এর মধ্যে আমাদের ডানপাশে বসা ড্রাইভার সাহেবের একটা ফোন এসেছে। সে এক হাতে মোবাইল ফোন কানের কাছে নিয়ে বাঁজখাই গলায় কথা বলছে। আরেক হাতে বনবন করে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে। তার দুপাশেই ঠাসাঠাসি করে তিনজন যাত্রী বসা। স্টিয়ারিং ঘোরাতে নিশ্চয়ই সমস্যা হচ্ছে। দুই হাতে স্টিয়ারিং ধরতে পারলে সুবিধা হতো। কিন্তু আরেক হাতে তো ফোন। কলটাও জরুরি নিশ্চয়ই…।
আমি আর এই দৃশ্য নিতে পারলাম না।
ঠাস করে ঘুমিয়ে গেলাম।