
রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস
নওরোজ ইমতিয়াজ
জগতের যে কোনো জিনিসই একদম শুরুর দিকে আমি হয় একটু কম বুঝি অথবা ভুলভাল পদ্ধতিতে বুঝি। আমার চারপাশে কত কুইক লার্নার। এদের মাঝে আমি নির্ভেজাল স্লো লার্নার। যে কোনো বিষয় শিখতে আর জানতে-বুঝতে আমার দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
ফেসবুক নামক জিনিসটাও যখন এই জনপদে প্রথম আবির্ভূত হলো, আমি আসলে ভালো করে বুঝে উঠতে পারছিলাম না, এটা দিয়ে কী হয় আর কী কী করা যায়।
ইন্টারনেটও তখন অতটা সহজলভ্য নয়। ব্রডব্যান্ড বা মোবাইল ইন্টারনেটের সঙ্গেও কারও সেভাবে পরিচয় ছিল না। ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে হলে ডায়াল-আপ মডেম নামক এক ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করতে হতো। সেই ডিভাইস আবার চিঁ-চিঁ জাতীয় যান্ত্রিক শব্দ উৎপন্ন করে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত কার পরে ইন্টারনেটের সঙ্গে কানেকটেড হতো।
বেশিরভাগ অফিস-আদালতে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্যে হাতে গোনা একটা-দুটো কম্পিউটার আলাদা করা থাকত। খুব জরুরি দরকার অথবা অনুমোদিত লোকজন ছাড়া সেই কম্পিউটারে হয়তো কারও বসারও অধিকার ছিল না। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভাইরাস আক্রমণ হওয়ার ভয়ে ওই কম্পিউটারের সঙ্গে অন্য কম্পিউটারের সরাসরি ল্যান যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রাখা হতো।
যখনকার কথা বলছি, সেই সময় আমার কর্মস্থল ছিল ঢাকা শহরের প্রায় উপকণ্ঠে। বাসা থেকে যেতে আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যেত এবং দিনের বড় অংশ সেখানেই কাটাতে হতো বলে টানা কয়েক মাসের জন্যে আমি মোটামুটি বন্ধু-বান্ধব বিবর্জিত অবস্থায় ছিলাম। অফিসের কলিগ ছাড়া চেনা-পরিচিত অন্য কারও সঙ্গে খুব বেশি দেখা-সাক্ষাৎ হতো না। নিয়মিত আড্ডাগুলোতেও যাওয়ার ফুরসত মিলত না।
ফলে ফেসবুকের মতো অভিনব সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এই দেশের সমাজব্যবস্থা আমূল বদলে দিতে চলে এসেছে, সেই খবর আমি পেলাম কিছুটা দেরিতে।
স্মার্টফোন নামক সকল কাজের কাজি মোবাইল ফোনও তখন বাজারে আসেনি। সবার হাতে হাতে যেসব ফোন শোভা পায়, তাতে আর যাই হোক, ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায় না। বড়জোর রিংটোন নিয়ে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়। প্রায়ই দেখি আশেপাশে কারও না কারও ফোন বাজছে এভাবে :
‘অ্যাই। ফোন আসছে তো। ফোন ধরো।’
‘আব্বু! তোমার ফোন। তোমার ফোন এসেছে তো। আব্বু…।’
‘আমায় ডেকো না। ফেরানো যাবে না….।’
যা হোক। মূল আলোচনায় আসি।
আমাদের অফিসে ইন্টারনেট সংযোগ সংবলিত একমাত্র কম্পিউটারের সামনে কখনই তেমন ভিড় দেখা যেত না। ইন্টারনেট কেমন করে ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে পরিস্কার ধারণা রাখত খুব অল্প কয়েকজন মানুষ। দরকারি ডাউনলোড বা ব্রাউজিং ছাড়া কারুরই তেমন ওই কম্পিউটারে বসার আগ্রহ ছিল না।
হঠাৎ একদিন দেখি ইন্টারনেট কম্পিউটারের সামনে অনেক মানুষের ভিড়। কেউ একজন হয়তো বসে বসে ইন্টারনেট ব্রাউজ করছে, তার পেছনে কমপক্ষে পাঁচ-সাতজন মানুষের লাইন। অপেক্ষমাণ লোকজন একটু পর -পর তাগাদা দিচ্ছে বসে থাকা মানুষটাকে দ্রুত কম্পিউটার ছেড়ে দেওয়ার জন্যে।
ইন্টারনেট কম্পিউটারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কৌতূহলবশত কখনও কখনও মনিটরের স্ক্রিনে উঁকি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছি। বেশি কিছু বুঝিনি। নীল আর সাদা রঙের একটা পেইজ। খুব ছোট ছোট অক্ষরে কী জানি লেখা। কিছু মানুষের ছবি।
যিনি ব্রাউজ করছেন, তার পেছনে অপেক্ষমাণ নারী-পুরুষরাও সেই স্ক্রিন দেখছেন এবং কী কী করতে হবে, সে বিষয়ে নানা পরামর্শও দিচ্ছেন। আমি তাদের পাশ কাটানোর সময় একবার-দুইবার ‘ফেসবুক’ শব্দটা আবছাভাবে কানে এসেও থাকতে পারে।
দেরিতে হলেও একদিন শুভক্ষণে ইন্টারনেট কম্পিউটার ফাঁকা পেয়ে আমি নিজের জন্যে ফেসবুকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে ফেললাম। প্রয়োজনীয় তথ্য ইনপুট দিয়ে অ্যাকাউন্ট অ্যাকটিভেট করার পরে ফেসবুক থেকে নানা রকম মানুষকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণের জন্যে আমাকে পরামর্শ দেওয়া হলো। কাউকেই চিনি না। যাকেই ছবি দেখে পছন্দ হলো, তাকে অ্যাড রিকোয়েস্ট পাঠালাম। কেউ কেউ দেখি আমাকেও ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল। যথারীতি ছবি দেখে পছন্দ হওয়ার ভিত্তিতে তাদের গ্রহণ করলাম।
প্রথমেই আমার স্ত্রীর নাম লিখে সার্চ দিলাম।
ধরা যাক, আমার স্ত্রীর নামের প্রথম অংশ ‘এফ’।
এই নামের কমপক্ষে এক ডজন নারী উপস্থিত হলো। নামের প্রথম অথবা দ্বিতীয় অংশ মিলে যায়, এ রকম আরও পঞ্চাশ জনকে পাওয়া গেল।
উদাহরণ : এফ হক, এফ চৌধুরী, এফ আজিম, এফ শিকদার, এফ মৌ, এফ লুবনা, এফ আহমেদ, এফ হোসেন, এফ মজুমদার, এফ ইসলাম, এফ কাদির, রুমিন এফ, শিউলি এফ, এফ শারমিন প্রমুখ।
আমি সীমাহীন ধৈর্য্য নিয়ে পৃথিবীর সকল ‘এফ’-কে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাদের অর্ধেকেরও বেশি ‘এফ’ বন্ধু হিসেবে আমাকে গ্রহণ করল (এবং বাকিরা সপ্তাহখানেকের মধ্যে)। বাস্তব জীবনে না হলেও, ফেসবুকে একসঙ্গে এতগুলো ‘এফ’-কে পেয়ে আমার যারপরনাই আনন্দ হলো।
যা হোক, এর বাইরে বন্ধুবান্ধব আর চেনা-পরিচিতদের কাউকেই অবশ্য সেভাবে খুঁজে পাওয়া গেল না। সার্চ অপশনে গিয়ে কয়েকজনের নামের বানান লিখে খুঁজে বের করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর চেষ্টা করলাম। কেউই তেমন সাড়া দিল না।
যেহেতু যে কোনো জিনিসই ভালো করে বুঝে উঠতে আমার দীর্ঘ সময় লেগে যায়, ফেসবুকেও কয়েক দিন এলোপাতাড়ি বিচরণ করতে গিয়ে অপরিচিত একদল মানুষের কার্যকলাপ, কথাবার্তা, ছবি ইত্যাদি অবলোকন করে আমার মাথা মোটামুটি আউলা-ঝাউলা হয়ে গেল।
একদিন বাসার কম্পিউটারে আমার স্ত্রী কিছুটা সাহায্য করল পরিচিত মানুষজনকে খুঁজে বের করে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে অ্যাড করতে নিতে। এই সুযোগে আমি প্রত্যেকের ভালো নাম বা পুরো নাম জেনে ফেললাম। নামের বানান ভুল হচ্ছিল দেখে অনেককে পাওয়া যাচ্ছিল না।
আমার স্ত্রী আমাকে চমৎকার একটি ছবি বেছে দিতেও সাহায্য করল, যাতে আমি সেটা প্রোফাইল পিকচার হিসেবে সেট করতে পারি।
এর মধ্যে একদিন অফিসে ইন্টারনেট সংবলিত কম্পিউটারটি ফাঁকা পেয়ে গিয়ে আবার বসলাম ফেসবুক নিয়ে। এর মধ্যে নানা মানুষের প্রোফাইলে ঘুরে এসে দেখেছি, যে যার মতো নিজেদের বর্তমান ও অতীত কর্মজীবন, পড়াশোনা আর বৈবাহিক অবস্থার তথ্য ফেসবুক প্রোফাইলের ‘অ্যাবাউট’ অংশে লিখে রেখেছে।
আমিও আমার প্রোফাইলের ‘অ্যাবাউট’ অংশে এইসব তথ্য পূরণ করার পর একদম শেষে ম্যারিটাল স্ট্যাটাসে ক্লিক করলাম। সেখানে ‘এফ’ টাইপ করলেই আমার স্ত্রীর নামের সাজেশন চলে আসার কথা। আমি ‘এফ’ লেখার সঙ্গে সঙ্গে এফ দিয়ে যতজনের নাম ছিল আমার বন্ধুতালিকায়, সবার নামের তালিকা সাজেশন আকারে চলে এলো। আমি আমার স্ত্রীকে সিলেক্ট করে সেভ দিলাম।
ইন্টারনেট ব্রাউজারের ওই পাতাটি এরপর নিজে নিজে রিফ্রেশ হওয়ার পর যে ফলাফলটি ভেসে উঠল, তা দেখে আমি রীতিমতো আতংকে জমে গেলাম এবং আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা হলো।
আমি পুরোপুরি নিশ্চিত যে আমি আমার স্ত্রীর নামের ওপরেই ক্লিক করেছি। কিন্তু ব্যাখ্যাতীত কোনো কারণে এই মুহূর্তে সেখানে অন্য রকম তথ্য দেখাচ্ছে :
নওরোজ ইমতিয়াজ ম্যারিড উইথ ফাহিমা আহমেদ!
এই ফাহিমা আহমেদ নামক ভদ্রমহিলাটি আমি যেই অফিসে কাজ করি, সেই অফিসে একই ডিপার্টমেন্টের কলিগ। অসামান্য রূপবতী। অফিসের বিবাহযোগ্য বেশিরভাগ তরুণ এই নারীর কাছে নিজেদের হৃদয় সমর্পণ করে রেখেছে।
ফাহিমা যখন হেসে ওঠে, তখন চারিদিকে মুক্তো ঝরতে থাকে।
ফাহিমা যখন অফিসের করিডোর ধরে হেঁটে যায়, তখন আশেপাশের সবাই দম বন্ধ করে তার হেঁটে যাওয়া অনুভব করার চেষ্টা করে।
ফাহিমা যখন কথা বলে ওঠে, তখন তার সুর-মূর্ছনার আবেশে শ্রোতাদের অনেকেরই মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হয়।
ফাহিমা যদি কারও দিকে তাকায় আর সেই মানুষটা যদি বিবাহযোগ্য যুবক ধরনের হয়, তাহলে সেই যুবক বা মানুষটার পরপর কয়েকটা হার্টবিট মিস হয়ে যায়।
এহেন ফাহিমা আহমেদের সঙ্গে এই অফিসে আমার অত্যন্ত ভদ্রোচিত, মার্জিত, সুশীল সম্পর্ক। আমি তার সঙ্গে অতিশয় নিরাপদ ও শোভন দূরত্ব বজায় রাখি। সেও আমাকে একজন ভদ্র ও অমায়িক সিনিয়র কলিগ হিসেবে যথাযথ শ্রদ্ধা ও সমীহ করে থাকে।
আমার স্ত্রীর নামটার ওপর ক্লিক করতে গিয়ে, যার নাম ‘এফ’ দিয়ে শুরু, ভুল করে আরেক ‘এফ’ আদ্যক্ষরের ‘ফাহিমা আহমেদ’ নামের ওপর ক্লিক পড়ে গিয়েছে চিন্তা করে আমি দ্রুত ভুল সংশোধনে তৎপর হলাম। ‘ম্যারিড উইথ’ অপশন এডিট করতে গিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ফ্রিজ হয়ে গেলাম।
ইন্টারনেট ডাউন!
আমি কয়েকবার ইন্টারনেট বাউজারের রিফ্রেশ বাটন ক্লিক করে নিশ্চিত হলাম, কোনো কারণে ইন্টারনেট সংযোগ সত্যি সত্যিই চলে গিয়েছে। ইন্টারনেট একবার ডাউন হয়ে গেলে কতক্ষণে তা আবার ঠিক হবে, তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। এক মিনিটও হতে পারে, এক ঘণ্টাও হতে পারে।
আমি কোনো ঝুঁকি নিলাম না। গ্যাট হয়ে ইন্টারনেটওয়ালা ওই কম্পিউটারের সামনে বসে থাকলাম। ইন্টারনেট সচল হওয়া মাত্র ভুল তথ্যটি সংশোধন করে ফেলতে হবে। একবার চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলে দেখা যাবে কেউ না কেউ বসে পড়েছে, তাকে সহজে ওঠানো যাবে না। তারপর লম্বা সিরিয়াল। এর মধ্যে ফেসবুকে ঢুকে কেউ আবার এই অস্বস্তিকর তথ্যটি দেখে না ফেললেই হয়।
এক মিনিট দুই মিনিট করে সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেট ফিরে আসার নমুনা দেখা যাচ্ছে না। আমার একটু একটু ওয়াশরুমেও যাওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু জীবন থাকতে এই চেয়ার ছেড়ে ওঠা যাবে না।
খোদার অশেষ মেহেরবানি যে মানুষের হাতে হাতে তখন স্মার্টফোন ছিল না। থাকলে ততক্ষণে নিশ্চয়ই প্রত্যেকের নিউজফিডে আমার এই রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস আপডেটের তথ্যটি ভাইরাল হয়ে যেত। তারপর সেখানে যেসব কমেন্ট পড়ত, তা যে মোটেও আমার জন্যে স্বস্তিদায়ক হতো না, বলাই বাহুল্য।
এর মধ্যে কয়েকজন এসে ইন্টারনেট কম্পিউটারের সামনে দিয়ে ঘুরে গিয়েছে। তাদের চোখে-মুখে জিজ্ঞাসা, ‘কাজ শেষ? আমি একটু বসতে পারি?’
আমাকে উদাস মুখে সবাইকে শুকনো হাসি দিয়ে বলতে হচ্ছে, ‘ইন্টারনেট ডাউন।’
কয়েকজন হতাশ হয়ে ঘুরে যাওয়ার পরে আমার পেছনে হাজির হলো স্বয়ং ফাহিমা আহমেদ, ‘ভাইয়া! কী করেন?’
আমি বিদ্যুতের শক খাওয়ার মতো ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠলাম। সতর্ক গলায় বললাম, ‘এই তো… ইন্টারনেট ডাউন। কখন আসবে, কে জানে।’
ফাহিমা মুখ অন্ধকার বানিয়ে বলল, ‘ওহ! এই কম্পিউটারে আজকাল প্রায়ই ইন্টারনেট ডাউন থাকে। যাই, তাহলে আইটি রুমে যাই। ওদের ইন্টারনেট কখনই ডাউন থাকে না।’
আমি প্রগলভ গলায় বললাম, ‘জরুরি কাজ বুঝি? কিছু ডাউনলোড করবেন?’
ফাহিমা বলল, ‘নাহ। সকাল থেকে অনেক কাজ করে ফেলেছি। এখন আমি এক ঘণ্টা একদম ফ্রি। একটু ফেসবুকিং করব।’
আমি তৃতীয় দফা জমে বরফ হয়ে গেলাম। ‘না না। আইটি রুমে যাবেন কেন! এই তো, এখনই ইন্টারনেট চলে আসবে। আমার কাজ বেশিক্ষণের না। একটা মেইল পাঠালেই কাজ শেষ। শুধু সেন্ড বাটন চাপব, এমন সময় নেট চলে গেল। তারপর আপনি বসতে পারবেন। কয়েক মিনিট…।’
ফাহিমার চোখমুখে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ‘শুধু সেন্ড বাটন চাপলেই হবে? তাহলে আমি করে দিচ্ছি। তারপর না হয় লগআউট করে দেব…। আপনি উঠে যেতে পারেন।’
আমি দুর্বল গলায় বললাম, ‘না মানে। থাক, আপনি আবার কষ্ট করবেন। তারচেয়ে আপনি পাঁচ মিনিট ঘুরে আসেন। ততক্ষণে নেট চলে আসবে মনে হয়।’
ফাহিমা হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা। আপনি তাহলে আর কাউকে চেয়ার ছেড়ে দেবেন না কিন্তু। আপনার পরে কিন্তু আমার সিরিয়াল।’
আমি দ্রুত মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললাম, ‘একদম চিন্তা নিয়েন না। আপনি না আসা পর্যন্ত আমিই চেয়ার দখল করে থাকব।’
ফাহিমা চলে গেল।
আমি আরেকবার রিফ্রেশ দিতেই দেখি ইন্টারনেট আবার স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি ‘ম্যারিড উইথ’ অপশন খুঁজে বের করে এডিট বাটনে ক্লিক করলাম। কাজ হলো না। আবার ক্লিক করলাম। কাজ হলো না। রিফ্রেশ দিয়ে আবারও ক্লিক করার চেষ্টা করলাম। এবারও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
আমি পাগলের মতো ক্লিক করে যাচ্ছি, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। ধীরে ধীরে আমার হাত-পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে, টের পাচ্ছি। ফাহিমা যদি চলে আসে, তাহলে তো সে নিশ্চয়ই মনিটরের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকবে, তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে তো নাম বদলানো যাবে না।
আবার লগআউট করে চলেও যাওয়ার উপায় নেই। ফাহিমা এসে তো ফেসবুকেই ঢুকবে। তারপর নিশ্চয়ই তাকে ট্যাগ করার নোটিফিকেশন পাবে। তখন তার নিশ্চয়ই মনে হবে, এই লোকটাকে তো ভালোই ভেবেছিলাম, এখন দেখা যাচ্ছে লোকটা আসলে যথাক্রমে মিচকা শয়তান, নীচ, বদমাশ, ইতর, ছোটলোক ইত্যাদি। এইসব চিন্তা করে এয়ার-কন্ডিশনড রুমের মধ্যে বসে থেকেও আমার চিকন ঘাম ছুটে গেল।
আমি ফেসবুক লগআউট করে আবার লগইন করলাম। তারপর সেটিংসে গিয়ে আবার ‘ম্যারিড উইথ’ অপশনের এডিট বাটন ক্লিক করলাম। এবার দেখি কাজ হচ্ছে। তাড়াতাড়ি ‘ফাহিমা আহমেদ’ রিমুভ করে আমার স্ত্রীর নামে ক্লিক করে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
‘ভাইয়া, ইন্টারনেট আসছে? আপনার কাজ শেষ?’
তাকিয়ে দেখি কফির মগ হাতে ফাহিমা জিসান পেছনে দাঁড়িয়ে।
‘হ্যাঁ। কাজ শেষ। এই নেন, লগআউট করে দিলাম। আপনি বসেন।’
ফাহিমা জিসান চেয়ারে বসে ফেসবুক ওপেন করতে যাচ্ছে, এটুকু দেখে আমি সরে এলাম। বড় বাঁচা বেঁচে গিয়েছি। আরেকটু হলেই বিরাট কেলেংকারি হতে যাচ্ছিল।
অফিসের টুকটাক কাজকর্ম শেষ করে দশ মিনিট পরে অফিস থেকে বের হয়েছি, এই সময় আমার স্ত্রীর ফোন।
‘তোমার কোনো কাজ নাই অফিসে?’
‘আছে তো। কেন, কী হয়েছে?’
‘অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করছি, তুমি ফেসবুকে আবোল তাবোল কী কী জানি করে যাচ্ছ।’
আমার গলা শুকিয়ে গেল, ‘কী করে যাচ্ছি?’
আমার স্ত্রী মেঘস্বরে বলল, ‘তুমি ম্যারিড উইথ হিসেবে ফাহিমা আহমেদের নাম দিয়েছ?’
আমি শুকনো গলায় বললাম, ‘ভুল করে ক্লিক পড়ে গিয়েছিল। তার একটু পরেই চেইঞ্জ করেছি তো। তারপর তোমার নাম দিয়েছি।’
‘হ্যাঁ। চেইঞ্জ করে আমার নাম দিয়েছ। কিন্তু ওইটা আমি না। তোমার ফ্রেন্ডলিস্টে তো দেখি আমার নামে এগার জন মহিলা আছে। কারে ট্যাগ করেছ?’
আমি তাড়াতাড়ি ফোন রেখে আবার দৌড়ঝাঁপ করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। ইন্টারনেট কম্পিউটারের সামনে তখনও যথারীতি ফাহিমা আহমেদ বসা।
আমাকে দেখে এবার তার চেহারা মোটেও হাসিতে উদ্ভাসিত হলো না। সে চোখ সরু করে জানতে চাইল, ‘ভাইয়া। আপনি কি আপনার ফেসবুকে ম্যারিড উইথে আমার নাম দিয়েছেন?’
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, ‘ইয়ে… মানে… ভুল করে দিয়ে ফেলেছিলাম। পরে কারেকশন করেছি।’
ফাহিমা চোখ-মুখ শক্ত করে বলল, ‘হুম। নোটিফিকেশন পেলাম। অলরেডি বহু মানুষ সেখানে লাইকও দিয়েছে। ক্লিক করে দেখি, সেটা আর শো করছে না।’
আমি পরের দিন হাতে সময় নিয়ে ফেসবুকে ঢুকে সত্যিকারের স্ত্রীকে রেখে বাদ বাকি সকল স্ত্রীকে রিমুভ করে দিলাম।
জীবন আনন্দময়!