রুদ্ধশ্বাস সূর্য উৎসব

নওরোজ ইমতিয়াজ

১.

সূর্য উৎসবের নাম কেন সূর্য উৎসব রাখা হলো, সেটা সৃষ্টিজগতের আরও অনেক অজ্ঞাত রহস্যের মতো জটিল আর কুয়াশাচ্ছন্ন।

এই উৎসব যে সংগঠনটা আয়োজন করে, তার নাম ‘বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’। মহাকাশের গ্রহ, নক্ষত্র, উপগ্রহ, উল্কা, ধূমকেতু, গ্রহাণু, নীহারিকা, কৃষ্ণগহ্বর ইত্যাদি নিয়ে তাদের কাজকর্ম। কিন্তু সূর্য উৎসবে সেইসব মহাকাশ সংক্রান্ত বিষয়ের চর্চা অতি সামান্য।

সূর্য উৎসব আয়োজন করা হয় প্রত্যেক বছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ পয়লা জানুয়ারি। ঋতুচক্রের নিয়ম অনুযায়ী তখন ঘোর শীতকাল। ঘন কুয়াশার কারণে বেশিরভাগ সময়ই হয়তো দুপুর পর্যন্ত সূর্যের চেহারাই দেখা যায় না। অথচ পয়লা জানুয়ারি বছরের প্রথম দিনে আকাশ ফরসা হওয়া মাত্র উৎসবে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে হিহি করে কাঁপতে-কাঁপতে বছরের প্রথম সূর্যকে বরণ করার জন্যে খোলা জায়গায় গিয়ে লাইন ধরে দাঁড়াতে হয়।

অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যিনি প্রধান কর্তা-ব্যক্তি, তার নাম মশহুরুল আমিন মিলন। মহাকাশ নিয়ে কাজকর্ম করেন বলে অনেক দিন ধরেই লোকসমাজে তার নাম হয়ে গিয়েছে ‘মহাকাশ মিলন’।

সেই মানুষটা বছরের প্রথম সূর্য বরণ করে নেওয়ার অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে গমগমে কণ্ঠে সংক্ষিপ্ত যে বক্তৃতা দেন, তা অনেকটা এ রকম:

‘বন্ধুরা! আমরা সবাই জানি, সূর্য আমাদের সৌরজগতের প্রধান নক্ষত্র। আমাদের সব রকম মহাকাশ-চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। আসুন, আমরা বছরের প্রথম সূর্যকে স্বাগত জানাই।’

সূর্য উৎসবে আসা লোকজনকে তখন হাসি-হাসি মুখে নতুন সূর্যকে স্বাগত জানানোর ভঙ্গি করতে হয়। এ সময় সবার মাথায় থাকে সূর্যের হাসি চিহ্নিত বিশেষভাবে নির্মিত মুকুট। গায়ে থাকে পুরু গরম কাপড়। দুই চোখে থাকে প্রচ- ঘুম। চেহারায় থাকে রাজ্যের বিরক্তি।

বায়ুম-লের ঘন কুয়াশার আচ্ছাদন ভেদ করে সূর্যদেব তাকে বরণ করে নেওয়ার সেই প্রাণান্ত চেষ্টার দৃশ্য দেখতে পান কিনা, দেখতে পেলেও তার কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়Ñ তা অবশ্য কেউ জানে না।

একবার সূর্য উৎসবে যাওয়ার জন্যে আমি, আমার স্ত্রী এবং আমাদের বেশ কয়েকজন বন্ধুবান্ধব ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার সদরঘাট থেকে ‘পারাবাত-১’ নামক একটা লঞ্চে উঠে বসেছিলাম।

বিশাল আকৃতির সেই জাহাজ ঢাকা-পটুয়াখালী রুটে চলাফেরা করে। ঈদের সময় নাকি দুই-তিন হাজার যাত্রীও হেসে-খেলে এটে যায়। আমরা সেখানে সব মিলিয়ে শ-দেড়েকও হবো কিনা সন্দেহ। ফলে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই হওয়ার কারণে দুর্ঘটনার আশংকা নেই বললেই চলে।

সূর্য উৎসবে অংশ নিতে আসা মানুষজনকে দেখা গেল, বেশ একটা নিরাপত্তা-নিরাপত্তা অনুভূতি নিয়ে লঞ্চের এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি করছে। চারিদিকে এক ধরনের ব্যস্ততার ছাপ আর উৎসবের আমেজ। শেষ মুহূর্তে আয়োজকদের দৌড়-ঝাঁপের সীমা নেই। সব মিলিয়ে চারদিনের প্রোগ্রাম। খাবার-দাবার আর পানি ছাড়াও আকাশ পর্যবেক্ষণের নানা যন্ত্রপাতি আর উৎসবের নানা সরঞ্জাম জাহাজে তোলার কাজকর্ম নেহাৎ সামান্য নয়।

দুপুরের দিকে বিকট শব্দে ভেঁপু বাজিয়ে জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার পরে আমি গেলাম মাস্টার ব্রিজে। সারেং কেমন চালায়, কেমন মানুষÑ সেটা নিজের চোখে একটু দেখে আসা দরকার। লঞ্চের মাস্টার, সারেং বা সুকানি… এদের সঙ্গে ভালোমতো পরিচয় থাকাও ভালো, কখন কী কাজে লেগে যায়।

এই তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয়-পর্বটা অবশ্য সুখকর হলো না।

মাস্টার সাহেব বুড়ো মানুষ। মুখ-ভর্তি দীর্ঘ দাড়ি। দৃষ্টি সারাক্ষণ ধর্মীয় অনুশাসন সংক্রান্ত বইপত্রে নিবদ্ধ। কথাবার্তা বলেন অতি সামান্য।

সুকানির সঙ্গে আলাপ জমল না। সেও দেখা যাচ্ছে অত্যন্ত স্বল্পভাষী। তার শুকনা-পাতলা শরীর। মাঝনদীতে ছোটখাটো ঝড় উঠলেই উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা।

সারেংয়ের চেহারা ডাকাত দলের সর্দারের মতো। সেও কথাবার্তা প্রায় বলে না বললেই চলে। মাঝেমধ্যে চোখ সরু করে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকায়। দেখলে বুক শুকিয়ে যায়। তিনজনের মধ্যে একমাত্র তাকেই মনে হলো জাহাজ চালানোর বিষয়ে পরিপূর্ণ মনোযোগ আছে। মুখচোখ পাথর বানিয়ে সে সারাক্ষণ স্থির-দৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। কেউ এসে ভালোমন্দ প্রশ্ন করলেও, ঠান্ডা গলায় তার জবাব দিয়ে যায়। কিন্তু পানি থেকে একবারের জন্যে চোখ সরায় না।

আমি জাহাজের অন্য লোকজনের সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম।

সূর্য উৎসবে যারা এসেছে, তারা প্রত্যেকেই হাসিখুশি আর উৎসবপ্রিয়। নিজেরাই নিজেদের উদ্যোগে যে যার মতো একজন আরেকজনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিচ্ছে। এখানে ওখানে ছোট ছোট দল বানিয়ে আড্ডা জমে উঠেছে। কেউ হয়তো হাসির কথা বলেছে, অল্পতেই একজন আরেকজনের গায়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে।

কেউ একজন হয়তো গান ধরার চেষ্টা করেছে, কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা যাচ্ছেÑ সবাই সমবেত হয়ে সেই গানে গলা মেলাচ্ছে।

এর মধ্যে কেউ একজন লাউড স্পিকারে গান ছেড়ে দিল। মমতাজের গান। তার সুতীব্র কণ্ঠে একটার পর একটা গান বেজে যাচ্ছে। তবে এর মধ্যেই শেষ পর্যন্ত একটা গান সবার মধ্যে দ্রুত হিট খেয়ে গেল। গানের কথাগুলো এ রকম :

আমি তোমার লাগি পাঙ্খা হইয়া

আমার পাঙ্খা হইল মন

মনের পাঙ্খা ঘুরে না তো

খুঁজে বেড়ায় মন

এই মনেতে ঘুরে ঘুরে আমারই অন্তরে শুধু প্রেমেরই আকাক্সক্ষা

ও পাঙ্খা পাঙ্খা পাঙ্খা পাঙ্খা পাঙ্খা হইল মন…

 

পাঙ্খা গানের সঙ্গে কেউ একজন নাচ শুরু করল, অল্প কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা গেলÑ সবাই সমবেত হয়ে সেটাকে দলীয় নৃত্যে পরিণত করেছে।

এই নৃত্যের দ্রুত নামকরণ করা হয়ে গেল। পাঙ্খা নৃত্য।

 

২.

সূর্য উৎসবে যোগ দিতে যারা ‘পারাবাত-১’ জাহাজে চড়ে বসেছেন, সেই মানুষগুলোর মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, ছাত্র, শিল্পী, সাহিত্যিক, অভিনেতা, সিনেমার পরিচালক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, গবেষক, পর্যটক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক-সহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।

আমার মতো দু-চারজন অপদার্থ প্রকৃতির কিছু লোকজনকেও দেখলাম সবজান্তা ভঙ্গিতে খুব ব্যস্ত হয়ে ঘোরাঘুরি করছে।

চারুকলা থেকে ছোট যে দলটা এসেছে, তারা পুরো জাহাজ নানা রকম রঙিন কাগজ আর কাপড় দিয়ে সাজিয়ে-টাজিয়ে একদম সত্যিকারের বিয়েবাড়ির চেহারা নিয়ে এসেছে। জাহাজ ছাড়ার পর থেকে তাদের ব্যস্ততার সীমা নেই। স্বেচ্ছাসেবক টাইপের কুড়ি-পঁচিশজনকে জড়ো করে নানা রকম ফানুশ, মুখোশ, মুকুট আর রঙিন প্রদীপ বানানোর কাজ চলছে। পুরো নিচতলার ডেকের বড় অংশজুড়ে তাদের বিপুল সেই কর্মযজ্ঞের নানা উদাহরণ, সফল কীর্তি আর ধ্বংসাবশেষের সাক্ষী হয়ে আছে।

নিচতলার ডেকের পেছনের দিকে বাকি অংশজুড়ে চলছে রান্নাবান্নার আয়োজন।

সব মিলিয়ে অন্তত বারো বেলার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। যাত্রা শুরু করার আগে প্রধান বাবুর্চিকে ডেকে জানতে চাওয়া হয়েছিলÑ চার দিনের জন্য খাওয়া আর রান্না ছাড়াও হাঁড়ি-পাতিল আর বাসনপত্র ধোয়ার কাজে মোট কতগুলো পানির জার প্রয়োজন হবে।

বাবুর্চি বিস্তর হিসাব-নিকাশ করে আত্মবিশ^াসের সঙ্গে জানিয়েছিল, ৬০/৭০টা জার হলেই চারদিনের জন্যে কাজ চলে যাবে। আয়োজকরা এই হিসাব শুনেও ঝুঁকি নেয়নি। বুদ্ধি করে সেই সংখ্যা আরেকটু বাড়িয়ে প্রায় দেড়শ পানির জার জাহাজে তুলে নিয়েছিল।

জাহাজ সদরঘাট ছেড়ে রওনা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আয়োজকদের সঙ্গে প্রধান বাবুর্চির তুমুল বিবাদ লেগে গিয়েছে। কারণ এরই মধ্যে সে ৮০টা জারের পানি খরচ করে ফেলেছে। আয়োজকরা এখন চিন্তায় অস্থিরÑ প্রথমই দিনেই যদি এতগুলো জার শেষ হয়ে যায়, তাহলে বাকি দিনগুলোতে কেমন করে চলবে!

কাজেই অবশিষ্ট জারের পানি শুধু রান্না আর পানীয় হিসেবে রেখে ধোয়াধুয়ির জন্য নদীর পানি ব্যবহার করে কীভাবে সংরক্ষিত পানি সাশ্রয় করা যায়, আয়োজকদের একাংশকে দেখা গেল, সেই রেশনিং ক্যালকুলেশন করতে বসেছে।

টানা কয়েক দিনের জন্যে যখন একদল মানুষ জাহাজে চড়ে বসে, তখন সবার সঙ্গে সবার দেখা হয় ডাইনিংয়ের সময়টায়। সে এক দারুণ দৃশ্য। সবাই প্লেট হাতে খাবারের জন্যে লাইনে দাঁড়িয়েছে। খাবারের টেবিলের সামনে পৌঁছানোর পর স্বেচ্ছাসেবকদের কেউ তাদের প্লেটে ভাত বেড়ে দিচ্ছেন, কেউ তরকারি, কেউ সালাদ, কেউ ডাল, কেউ সবজি।

এত মানুষজনের মধ্যে সবাই হয়তো সব আইটেম খায় না। যারা মাছ খায় না অথবা মাংস খায় না, তাদের জন্যে বিশেষ ব্যবস্থায় ডিম সেদ্ধ করা হয়েছে।

ঢাকার একটা কলেজ থেকে একদল ছেলে-মেয়ে এসেছে। এদের মধ্যে একটা ছেলে মনে হয় মাছ খেতে পছন্দ করে না। তার প্লেটে ডিম সেদ্ধ তুলে দেওয়া হয়েছে। সবজি আর ডাল দিয়ে ভাতটুকু খেয়ে ডিমটা সে পরে খাবে চিন্তা করে প্লেটের এক কোণে সরিয়ে রেখেছিল।

তার অন্য বন্ধুরা সেই ডিম সেদ্ধ প্লেট থেকে সরিয়ে ফেলার জন্যে শুরু থেকেই নানা চেষ্টা করে যাচ্ছে। ছেলেটা ডিমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন্ধুদের দেখিয়ে-দেখিয়ে ডিমের ওপর থুতু ছিটিয়ে দিল, যাতে এরপর আর কেউ হাত না বাড়ায়।

বন্ধুরাও কম যায় না। একজন সেই ডিম তুলে নিয়ে সাদা অংশটা ভেঙে কুসুমটা বের করে দিব্যি মুখের মধ্যে চালান করে দিল। যার ডিম, সে দেখা যাচ্ছে তার বন্ধুদের এই উদ্ভাবনী শত্রুতায় হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।

এ রকম ছোটখাটো ইন্টারেস্টিং নানা ঘটনায় ধীরে ধীরে পেরিয়ে যাচ্ছে সময়।

সন্ধ্যা নামার পরে মহাকাশ বিষয়ক কাজকর্মগুলো শুরু হলো। অ্যাস্ট্রোনিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যারা একদম খাঁটি সদস্য, তারা দোতলার ডেকে লোকজনকে বসিয়ে প্রজেক্টর আর সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে চাঁদ, তারা, নক্ষত্র, উল্কাপি- ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানমূলক বক্তৃতা দেওয়ার চেষ্টা করল। একজন-দুজন মহাকাশ বিশেষজ্ঞ হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে গম্ভীর গলায় বাংলাদেশের মহাকাশ গবেষণা পরিস্থিতি, নাসার সর্বশেষ কর্মকা-ের অগ্রগতি, সৌরজগতের সাম্প্রতিক আবিষ্কার ইত্যাদি সম্পর্কে লেকচার দিলেন।

অবশ্য এইসব লেকচার শোনার বিষয়ে কারও মধ্যে তেমন আগ্রহ দেখা গেল না। তবে টেলিস্কোপে তারা দেখার বিষয়টা দেখা গেল হিট করেছে। জাহাজের ছাদে যেখানে টেলিস্কোপ বসিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখানেই বেশি মানুষের জটলা। কনসার্ট বা খেলা দেখার সময় স্টেডিয়ামের বাইরে যে রকম লম্বা লাইন হয়, টেলিস্কোপের সামনেও সেই রকম দীর্ঘ সারি।

অবশ্য ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডার রাতে আকাশজুড়ে প্রকা- চাঁদের আলো এবং ঘন কুয়াশার মধ্যে বিন্দু বিন্দু তারা-নক্ষত্র কতখানি কী দেখা যাবে, সেটা নিয়ে অবশ্য কেউ মাথা ঘামাল না।

 

৩.

সন্ধ্যার দিকে চাঁদপুর পার সময় জানা গেল, এই বিশাল জাহাজের মাস্টার, সুকানি বা সারেং কেউ আগে কোনো দিন সুন্দরবনে যায়নি। তারা ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে বড় বড় ঢেউ তুচ্ছ করে নিয়মিত ঢাকা থেকে বরিশাল অথবা পটুয়াখালীর নৌপথে যাওয়া-আসা করে। কিন্তু সুন্দরবন তাদের কাছে নতুন।

তবে এটা বড় কোনো সমস্যা না। যাওয়ার পথে খুলনা অথবা মংলা বন্দরে থেমে একজন পাইলট নিয়ে নিলেই হবে।

এই পাইলট মানে প্লেন চালানোর পাইলট না, নির্দিষ্ট কোনো জলপথে যে-ই নাবিক পথ দেখান, তাকে বলা হয় পাইলট। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই মানুষটা হন স্থানীয় কোনো নাবিক, যিনি নির্দিষ্ট সেই জলপথ হাতের তালুর মতো চেনেন। কোথায় পানি কতখানি গভীর, কোথায় আছে ডুবোচর, কোন মৌসুমে কোথায় ঢেউ খুব ভয়ানকÑ সব তার মুখস্থ।

রাতভর জাহাজ চালিয়ে আমরা মংলা পার হলাম ভোর রাতের দিকে।

অত রাতে বন্দরে নেমে কে আর পাইলট খুঁজতে যায়। জাহাজের মাস্টার, সুকানি আর সারেং ওই ঝামেলায় না গিয়ে দু-চোখ যেদিকে যায় ভঙ্গিতে লঞ্চ চালিয়ে যেতে থাকল। সেই কারণে পরবর্তী সময়ে কী বিপদের সূচনা হয়েছিল, সেটা কিছুক্ষণ পরেই বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছি।

তার আগে বলে নেই, প্রত্যেক দিনই একটু পর পর নানা রকম কর্মকা- চলছে জাহাজের বিভিন্ন অংশে। এটা-সেটা নিয়ে ওয়ার্কশপ, বক্তৃতা, প্রদর্শনী অথবা গান-বাজনা।

আমাদের গন্তব্য যেহেতু সুন্দরবন, কাজেই সুন্দরবন নিয়ে একটা সেশন না করলে খারাপ দেখা যায়। বনের ভেতর নামার পর কী-কী করণীয়; ঘন জঙ্গলে তীক্ষè শ^াসমূলের মধ্য দিয়ে কীভাবে হাঁটতে হবে; হরিণের পাল দেখা গেলে কীভাবে চুপ করে থাকতে হবে যাতে তারা ভয় পেয়ে না ছুটে পালিয়ে যায়; বাঘ বা কুমির থেকে কীভাবে সাবধান থাকতে হবে; বনের ভেতরে হারিয়ে গেলে কীভাবে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়Ñ এইসব বিষয়ে আগে থেকে আলোচনা করে না নিলে পরে দেখা যাবে ছোটখাটো ঝামেলা হয়ে যাচ্ছে।

সুন্দরবন সংক্রান্ত সেই সেশন শুরু করতে গিয়ে দেখা গেল, দেড়শ জনের মধ্যে আগে সুন্দরবনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে, এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা দুই-তিনজন। তারা অবশ্য কেউ সুন্দরবনের গাছপালা, ভূপ্রকৃতি বা জন্তু-জানোয়ার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ না।

আর কেউ বলতে রাজি হলো না দেখে আমাকেই সবার সামনে গিয়ে সুন্দরবন নিয়ে ছোটখাটো বক্তৃতা দিতে হলো।

সুন্দরবন আসলে কত বড়, সেখানে কী কী ধরনের বন্যপ্রাণী বাস করে, কোথায় কী কী ধরনের বিপদ-আপদ ওঁত পেতে থাকতে পারেÑ সেগুলো সম্পর্কে যা যা জানা ছিল সবিস্তারে বর্ণনা করার পর শেষে একটু যোগ করে দিলাম, ‘বনের মধ্যে হাঁটার সময় কেউ দয়া করে দলছাড়া হবেন না। আমরা যাচ্ছি কটকা আর কচিখালী। সেখানে সারা পৃথিবীর মধ্যে সেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। সবচেয়ে বেশি বাঘ এই কটকাতেই বাস করে। আমরা যখন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাব, তখন তাদের বেডরুম আর ড্রয়িংরুমের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাব। মনে রাখবেন, একটা বাঘ দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বিশাল, কিন্তু সে চাইলে একটা ছোটখাটো সাইজের গাছ বা ঝোঁপের আড়ালে নিজেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখতে পারে। আপনি হয়তো বাঘকে দেখতে পাবেন না। কিন্তু বাঘ আড়াল থেকে ঠিকই আপনাকে দেখবে। আমাদের জানামতে, ধারেকাছে কোনো মানুষখেকো বাঘ নাই। তারপরও বলা যায় না, সে যদি ক্ষুধার্ত থাকে আর আমাদের বিপজ্জনক বলে মনে করে, তাহলে আক্রমণ করেও বসতে পারে। বাঘ কখনও আস্ত একটা দলকে আক্রমণ করে না। সে বেছে নেয় নিঃসঙ্গ কাউকে। কাজেই কেউ যদি দলছুট হয়ে একা একা হাঁটতে থাকেন, তাহলে বাঘের আক্রমণের শিকার হওয়ার রিস্ক সবচেয়ে বেশি। কেউ দলছুট হবেন না।’

সুন্দরবন নিয়ে আমার এইসব বিজ্ঞ বিজ্ঞ কথাবার্তা শুনে উপস্থিত সবাই ধরে নিল, আমি নিশ্চয়ই একজন ছোটখাটো সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ এবং সম্ভবত আসন্ন জঙ্গল অভিযাত্রার গাইড। কাজেই দেড়শজনের মধ্যে একশজনই বুকে থাবা দিয়ে ঘোষণা করলÑ বনের মধ্যে আমরা যখন সত্যি সত্যি হাঁটাহাঁটি করব, তখন তারা প্রত্যেকেই আমার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করবে।

সুন্দরবন নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা সেশন শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও উপস্থিত লোকজনের কাউকে চলে যেতে দেখা গেল না। তারা নানা রকম প্রশ্ন করতে লাগল।

কী ধরনের জামা-কাপড় পড়ে যাওয়া উচিত।

বনের মধ্যে ঘোরাঘুরি সময় ছোট ছোট দল বানানো হলে, একেকটা দলে কতজন করে থাকা উচিত।

কারও যদি বনের মধ্যে হঠাৎ বাথরুম পেয়ে যায়, তাহলে সে কি একা একা জাহাজে ফিরে আসতে পারবে নাকি বনের মধ্যে টয়লেট করার ব্যবস্থা আছে।

বনের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেললে তখন কি জোরে জোরে চিৎকার করতে হবে, নাকি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেই চলবে, তারপর কেউ না কেউ গিয়ে তাকে বা তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসবে।

হঠাৎ বাঘের মুখোমুখি গেলে কি উল্টোদিকে ঝেড়ে দৌড় দেওয়া উচিত হবে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি হাসি হাসি মুখ করে অত্যন্ত ধৈর্য্যরে সঙ্গে সবার সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলাম। বন্যপ্রাণীরা যেন বিরক্ত না হয়, সে জন্যে অভিযাত্রীদের সবাইকে দল বেঁধে চলার পাশাপাশি বেশি শব্দ না করতে এবং রঙচঙা জামা-কাপড় না পরার জন্যেও ভালো করে পরামর্শ দিয়ে দিলাম।

 

৪.

বিকেল নাগাদ আমাদের জাহাজ গিয়ে পৌঁছাল হিরণ পয়েন্ট।

আমি আসলে সত্যি সত্যি সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু হিরণ পয়েন্টে পৌঁছে যাওয়ার কারণে মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগল। কী জানি মনে পড়ি পড়ি করেও পড়ছে না।

আমাদের তো মংলা থেকে পশুর নদী হয়ে কিছুদূর দক্ষিণে নেমে এসে হাতের বামে চাঁদপাই রেঞ্জ ধরে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে কোথা থেকে জানি একটা খাল ধরে নেমে যেতে হয়। কিন্তু এই পথের কোথাও হিরণ পয়েন্ট থাকার কথা না। তার মানে সম্ভবত আমরা বামের পথটা বাদ দিয়ে সোজা দক্ষিণে সমুদ্র বরাবর নিচে নেমে গিয়েছি। মংলা থেকে পাইলট না নেওয়ার কারণে এই ভুলটা হয়েছে। এখন হিরণ পয়েন্ট থেকে কোন পথ দিয়ে কটকার দিকে যেতে হয়, কে জানে।

যাই হোক, পথ ভুল করার বিষয়টা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাল না। হিরণ পয়েন্টের নাম সবাই এর আগে কম-বেশি শুনেছে। এখন সেটা চোখের সামনে দেখতে পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত।

আমার নিজেরও একটু একটু আগ্রহ ছিল হিরণ পয়েন্ট দেখার। আগে কোনোদিন আসা হয়নি। সুন্দরবনের অন্যান্য অংশের চেয়ে তেমন কোনো পার্থক্য অবশ্য চোখে পড়ল না। গাছপালা আর ল্যান্ডস্কেপ সব কিছু একই রকম। তবে নদীটা এখানে অনেক চওড়া। আমরা থেমেছি নদীর বামপাশের তীর বরাবর। সেখানে একটা জেটির মতো রয়েছে। কোস্টগার্ডের একটা ছোট জাহাজও দেখা গেল কাছাকাছি নোঙ্গর করে আছে।

ঠিক হলোÑ রাতে এখানেই কাটিয়ে কাল সকালে কটকা আর কচিখালীর দিকে রওনা দেওয়া যাবে।

রাত নামার পরে অবশ্য সূর্য উৎসবের নিয়মিত কার্যক্রমের কিছু কিছু শুরু হয়ে গেল।

চারুকলার লোকজনের নেতৃত্বে যেসব প্রদীপ বানানো হয়েছিল, সেগুলো ভাসানো হলো নদীতে। মাটির সরায় রঙিন কাগজ ঘিরে দিয়ে সরার মাঝখানে কিছুটা তেল আর কাপড়ের ফিতার মতো দেখতে একটা সলতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সলতেয় আগুন দিলে রঙিন কাগজের কারণে রঙিন একটা আলো ছড়াতে থাকে।

শয়ে শয়ে মঙ্গল প্রদীপ ভাসানো হচ্ছে নদীতে। সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য। যারা সেটা না দেখেছে, তাদের কোনোভাবেই বোঝানো যাবে না।

আমাদের জাহাজ নদীতে নোঙ্গর করে দাঁড়িয়ে আছে। অল্প অল্প ঢেউয়ের দোলায় দুলছে। অভিযাত্রীরা একটা একটা করে রঙিন মঙ্গল প্রদীপ ভাসিয়ে দিচ্ছে পানিতে। ভাটার টানে ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে লাইন ধরে সেগুলো ভেসে চলে যাচ্ছে দক্ষিণে সাগরের দিকে। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, বেগুনি, কমলা নানা রঙের প্রদীপের রঙিন আলোর আঁকাবাঁকা সারি তৈরি হয়েছে অনেক দূর পর্যন্ত।

ফটোগ্রাফার যারা ছিল, তারা খুব ব্যস্ত হয়ে ক্যামেরা নিয়ে এই অপার্থিব দৃশ্যটার ছবি তুলতে লাগল। অভিযাত্রীদের কেউ কেউ ভাসিয়ে দেওয়ার আগে জ¦লন্ত প্রদীপ হাতে নিয়েও নিজেদের ছবি তুলে রাখল, যাতে ভবিষ্যতে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া যায়।

রাতটা খুব চমৎকার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে শেষ হলো।

শেষ হয়ে গেল, এটা অবশ্য বলা কঠিন। সব কাজ শেষ হওয়ার পর বিপুল উদ্যমে বিপুল আওয়াজে মমতাজের ‘পাঙ্খা পাঙ্খা’ গানটা আবার বিরতিহীনভাবে বাজতে শুরু করল। সেই সঙ্গে উদ্দাম ‘পাঙ্খা নৃত্য’।

সেই নৃত্য আর অনবরত গান কখন শেষ হয়েছিল, কেউ বলতে পারে না। বেশিরভাগ মানুষই ততক্ষণে ঘুমিয়ে গিয়েছে।

 

৫.

পরদিন সকালে অনেক কুয়াশার মধ্যে দিয়ে জাহাজ চলতে শুরু করল একটা খালের মধ্যে দিয়ে।

হিরণ পয়েন্টের লোকজনের কাছ থেকে জাহাজের মাস্টার আর সারেং ভালো করে পথঘাটের হদিস জেনে-বুঝে নিয়েছে। কী বুঝেছে, তারাই জানে। খালটা তেমন চওড়া নয়, কিন্তু জাহাজ চলছে ঝড়ের গতিতে। বেপরোয়া জাহাজ-চালনার ফলাফলও পাওয়া গেল খানিক বাদেই।

পুরো জাহাজ হঠাৎ প্রচ- ঝাঁকুনি দিয়ে খালের মাঝখানে ডুবোচরে ঘ্যাঁচাৎ করে আটকে গেল। ঝাঁকুনি খেয়ে অভিযাত্রীদের বেশিরভাগই প্রথমে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়লেও, জাহাজ সামান্য পিছিয়ে নিয়ে একটু ডানপাশে সরে আবার চলতে শুরু করায় সবাই যে যার কাজে মন দিল।

যারা সুন্দরবনের ভেতরের এইসব নদীনালা সম্পর্কে আগে থেকেই জানত, শুধু তারা বুঝে ফেলল, বিপদ মাত্র শুরু হয়েছে। সুন্দরবনের বিশাল এলাকায় মাকড়শার জালের মতো একটার পর একটা নদী অথবা খাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও, সেগুলোর গভীরতা মোটেও বেশি নয়। ফলে জাহাজ চালাতে হবে খুব দেখে-শুনে আর ধীরগতিতে। ¯্রােতের গতি-প্রকৃতি দেখেই বুঝে নিতে হবেÑ কোথায় পানি একটু গভীর, কোথায় ডুবোচর রয়েছে।

আমাদের জাহাজের মাস্টার, সারেং এবং সুকানি প্রমত্তা মেঘনা নদীতে বিপুল জলরাশিতে ফুল স্পিডে ধুমধাম জাহাজ চালিয়ে অভ্যস্ত। তারা যে এ রকম অল্প গভীর পানিতে একেবারেই যে অনভিজ্ঞ, সেটা পরের পনের মিনিটের মধ্যেই জাহাজের আরোহীদের কারও বুঝতে বাকি থাকল না।

জাহাজ একবার এখানে আটকায় তো পরের বার ওখানে আটকায়। একটু পরে-পরে ডুবোচরে ঘষা খেয়ে একেকবার প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে। বিকট আওয়াজ শুনে প্রত্যেকবার মনে হতে থাকে জাহাজের তলা ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছে।

একবার তো খালের মধ্যে একটা তীক্ষè মোড় ঘুরতে গিয়ে ঠিকমতো তাল সামলাতে না পেরে পুরো জাহাজ দড়াম করে তীরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গেল। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা যদি সেটা মেপে দেখত, তাহলে কোনোভাবেই তা রিখটার স্কেলে বিশ-পঁচিশের কম হওয়ার কথা না। ধাক্কার চোটে কেউ কেউ দাঁড়ানো অবস্থা থেকে এখানে ওখানে ছিটকেও পড়লেন।

এই ঘটনার কারণে সবার মধ্যে এক ধরনের চাঞ্চল্য দেখা দিল।

কেউ কেউ ওপরে মাস্টার ব্রিজে গিয়ে চেঁচামেচি শুরু করল, ‘কী হচ্ছে এইসব? দেখে চালাবেন না?’

জাহাজ চালানোর দায়িত্ব যাদের ওপর, তাদের মধ্যে অবশ্য কোনো ভ্রক্ষেপ নেই। তারা একবার এই তীরে আরেকবার ওই তীরে জাহাজটাকে ধাক্কা খাওয়াতে খাওয়াতে এবং একটু পর পর ডুবোচরে তুলে দিতে দিতে বেশ একটা অকুতোভয় স্টাইলেই জাহাজ চালিয়ে নিতে লাগল।

খুলনা বা মংলা থেকে কেন পাইলট নেওয়া হয়নি, এতক্ষণে সবার কাছেই সেই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কটকা যাওয়ার জন্যে এটাই কি একমাত্র পথ কিনা, সেই অনেকে জিজ্ঞেস করছেন।

কিন্তু কে দেবে জবাব! মাস্টার বা সারেংকে কিছু জিজ্ঞেস করা হলে তারা তো কিছুই বলে না।

যেহেতু এক ধরনের আতংক ছড়িয়ে পড়েছে, অনেকেই জড়ো হয়েছে মাস্টার ব্রিজের সামনে। সবার চোখে-মুখে প্রশ্ন আর শংকা। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে জবাব খুঁজছে।

এ ধরনের বিপর্যয়-পরিস্থিতি দেখা দিলে সব সময়ই একদল মানুষকে পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে দায়িত্ব আর কর্তব্যবোধ সদা-জাগ্রত হয়ে থাকে। তেমনই কয়েকজন উৎসাহী লোকজনকে দেখা গেল, কাছেপিঠে কিছু জেলে নৌকা দেখতে পেয়ে জাহাজ থামিয়ে হাত-পা নেড়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছেন।

উৎসাহী মানুষজনের মধ্যে নেতা গোছের যারা, তাদের মুখপাত্রের নাম মেসবাহ য়াযাদ। খুবই উদ্যোগী, তৎপর আর সজ্জন প্রকৃতির মানুষ। জেলেদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শেষে জাহাজে ফিরে এসে তিনি জানালেন, এই জায়গাটার নাম দুবলার চর। সুন্দরবনের ভেতরে এটা একটা বিরাট জেলেপল্লী। কটকা এখান থেকে আরও কয়েক ঘণ্টার পথ।

দুবলার চরের নামও জাহাজের সবাই অনেক আগে থাকতেই শুনেছে। প্রত্যেক বছর শীত আসার আগে আগে এখানে রাস মেলা হয়।

হিরণ পয়েন্টের মতো দুবলার চরেও আমার এর আগে কোনো দিন আসা হয়নি। এবার ঘটনাক্রমে পথ ভুল করে চলে এলেও, বনের মধ্যে নেমে ঘুরে-ফিরে দেখার সুযোগ হলো না। আমাদের মূল গন্তব্য আর নানা রকম কর্মসূচি যেহেতু কটকায়, কাজেই আরও দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই রওনা দেওয়া ভালো।

মেসবাহ য়াযাদ বুদ্ধি করে দুজন মাছ ব্যবসায়ীকে সঙ্গে করে জাহাজে তুলে এনেছেন। এরা এই অঞ্চলে ব্যবসার কাজে নিয়মিত নৌকা নিয়ে চলাফেরা করেন। জঙ্গলের নদীনালা পথঘাট সব মুখস্থ।

মাছ ব্যবসায়ীরা পথ দেখাতে শুরু করায় জাহাজ এবার অবশ্য ভালোভাবেই চলছে। অতর্কিতে কোনো ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে না। খালের পানি যেদিকে সবচেয়ে গভীর, জাহাজ এখন সেখান দিয়েই চালানো হচ্ছে। কিছুক্ষণ নির্বিঘেœ চলার পর অচিরেই অভিযাত্রীদের শংকা দূর হলো। তারা যে যার কাজে মন দিলেন।

প্রকৃতি প্রেমিক লোকজন অবশ্য জাহাজের ছাদে অথবা ডেকের কিনারায় রেলিং ধরে বাইরের বন-জঙ্গল পর্যবেক্ষণ করেই কাটিয়ে দিল। খাল কোথাও কোথাও চওড়া থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেশ সরু। মাঝে মধ্যে হাত বাড়ালে গাছের পাতা ছোঁয়া যায়।

খুব খেয়াল করে তাকালে, গাছের ফাঁকে ফাঁকে দূরে হরিণের পালও দেখা যায়। এত বড় জাহাজ আর ইঞ্জিনের গুরুগম্ভীর আওয়াজের কারণে একটা হরিণও হয়তো সামনে আসবে না। কিন্তু এর আগে যতবার কটকা গিয়েছি, প্রত্যেকবার দেখেছি জাহাজ যদি কোনো শব্দ উৎপন্ন না করে চুপচাপ থেমে থাকে, তাহলে শয়ে শয়ে হরিণ তীরে কাছাকাছি চলে আসে। দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। কোনো শব্দ শুনলেই আবার সব দৌড়ে পালিয়ে যায়।

হরিণের তুলনায় বানর অবশ্য অত্যন্ত সাহসী। গাছের ফাঁকে ফাঁকে দু-চারটা ধূসর বানর চোখে পড়ল। কে জানি বলল, সে খালের তীরে একটা কুমির দেখেছে। কাদার মধ্যে মিশে ছিল বলে প্রথমে আলাদা করা যায়নি। আমাদের জাহাজ কাছাকাছি চলে আসায় বিরক্ত হয়ে পানিতে ডুব দিয়েছে।

জাহাজের এখানে সেখানে পায়চারি করতে গিয়ে আমি কয়েকটা ছোটখাটো ইন্টারেস্টিং বিষয় আবিষ্কার করলাম। একদল অচেনা মানুষ সাময়িক সময়ের জন্যে হলেও একসঙ্গে এক জায়গায় একত্রিত হলে, তাদের মধ্যে বিচিত্র সখ্য গড়ে ওঠে। আগ্রহ আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ছোট ছোট দল তৈরি হয়ে যায়।

একজন হয়তো গিটার নিয়ে এসেছিল। সে টুংটাং বাজাচ্ছে। তাকে ঘিরে আরও আট-দশ জন গোল হয়ে বসেছে। কোরাসে নানা রকম গান হচ্ছে।

একজন হয়তো বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বুদ্ধি করে এক প্যাকেট তাস নিয়ে এসেছিল। সেই তাসের প্যাকেট ব্যাগ থেকে বের করা মাত্র তাকে ঘিরে জুটে গিয়েছে আরও সাত-আট জন মানুষ।

একজন হয়তো পাশের জনের সঙ্গে রাজনীতির কোনো আলোচনা শুরু করেছেন। নিশ্চিতভাবেই তারা দুজন হয়তো আলাদা দুটো দলের সাপোর্টার। তাদের জটিল তর্ক-বিতর্ক আর বিশ্লেষণাত্মক আলোচনায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই আরও জনা-কুড়ি মানুষ যুক্ত হয়েছেন।

একজন হয়তো তার সোনালি অতীত আর কীর্তিকর্মের ঝাঁপি খুলে বসেছেন। যেসব মানুষের সত্যিকার অর্থে তেমন কোনো কাজকর্ম নেই, তারা গোল হয়ে বসে খুব আগ্রহ নিয়ে সেই বক্তৃতা শুনছে।

তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ঘটনা যেটা পাওয়া গেল, তার কেন্দ্রীয় চরিত্রটির নাম জেরিন। জাহাজে যত নারীকে দেখা যাচ্ছে, জেরিন নামক মেয়েটি সম্ভবত তাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময়ী আর রূপবতী তরুণী। ব্যাচেলর ফটোগ্রাফারদের কম-বেশি প্রত্যেককেই জেরিনের পেছনে ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। সেকেন্ডে সেকেন্ডে শোনা যাচ্ছে তাদের ক্যামেরার প্রাণপণ ক্লিক ক্লিক শব্দ। যে হারে ছবি উঠছে, তাতে কারও ক্যামেরার মেমোরি কার্ডে আর জায়গা থাকার কথা না। ফটোগ্রাফারদের মধ্যে যারা একটু চালু আর চালাক প্রকৃতির, তারা অবশ্যই ছবি তোলার পরে ক্যামেরার প্রিভিউ স্ক্রিনে সদ্য তোলা ছবি জেরিনকে দেখিয়ে নিচ্ছে।

যারা ব্যাচেলর, কিন্তু ক্যামেরা নেই, সেই হতভাগ্য তরুণদেরও দেখলাম আশেপাশে মুখ কালো করে বসে আছে। তাদের দেখাচ্ছে সত্যিকারের দেবদাসের মতো।

 

৬.

দিন শুরু হয়েছিল গাত্তাগোত্তা খাওয়ার মধ্য দিয়ে। জাহাজ ঠিকমতো চলতে শুরু করায় সবার মধ্যে এক ধরনের স্বস্তির ভাব চলে এসেছিল। একটু একটু উৎসব উৎসব ভাবও দেখা যাচ্ছিল। ছাদের খোলা ডেকে একদল তরুণ গলা ফাটিয়ে ‘পাঙ্খা পাঙ্খা’ গানটা হেঁড়ে গলায় গাইবারও চেষ্টা করছিল।

সেই শান্তিপূর্ণ ব্যাপারটা দীর্ঘায়িত হলো না।

দুপাশে ঘন বনের মধ্যে খাল দিয়ে অনেকক্ষণ চলার পর জাহাজ শেষ পর্যন্ত সাগরে বেরিয়ে এসেছে। উপকূল ধরে চলার সময় সাগরের একটু আধটু ঢেউয়ের কারণে জাহাজও একটু আধটু দুলছিল। সেটাকেও সবাই অ্যাডভেঞ্চার হিসেবেই নিয়েছে।

কটকার মোহনা, যেখানে নদী এসে সাগরে মিশে গেছে, সেই জায়গাটা যখন দুই-তিন মাইল দূরের দৃষ্টিসীমায়, সুন্দরবনের ঘন সবুজ গাছপালার সারি দেখা যাচ্ছে, এমন সময় আমাদের জাহাজ আবার ডুবোচরে আটকে গেল।

চারিদিক অথৈ সমুদ্র। বড় বড় ঢেউ। এর মাঝখানে পানির নিচে যে ডুবোচর থাকতে পারে, সেটা কারও কল্পনায় ছিল না। সবাই আবার ‘হায়-হায়’ করে ওঠার অবস্থা।

জাহাজের মাল্লারা অবশ্য দেরি করল না। তারা বড় বড় বাঁশ নিয়ে কাজ শুরু করে দিল। বাঁশ পানিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে গভীরতা মেপে মেপে জাহাজের মাস্টারকে সংকেত দিতে লাগল। আর সেই অনুযায়ী মাস্টার সাহেব জাহাজটাকে একবার পিছিয়ে একবার এগিয়ে ডানে-বায়ে কেটে সামনে নয়তো পেছনে সরানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হলো না। জাহাজের পেছনে প্রবল বেগে প্রপেলার ঘোরার কারণে চারপাশে পানি ঘোলা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জাহাজ এক চুলও এগুচ্ছে না।

আধঘণ্টা বিস্তর চেষ্টাচরিতের পরে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিতে হলো।

জাহাজের মাস্টার এগিয়ে এসে নির্বিকার মুখে ঘোষণা দিলেন, ‘ভাটা শুরু হয়ে গেছে। এইখানে পানি বেশি গভীর না। জাহাজ আটকায়ে গেছে। জোয়ার না আসা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করতে হবে।’

কেউ কেউ প্রশ্ন করল, ‘এটা না সমুদ্র? তাহলে পানি এত কম গভীর কেন?’

মাস্টার অমায়িক হেসে জবাব দিলেন, ‘সেইটা তো আল্লাহ পাকের ইচ্ছা। উনি সমুদ্র বানায়েছেন। জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি করেছেন। উনার ইচ্ছায় আমরা আটকা পড়েছি।’

কেউ কেউ প্রশ্ন করল, ‘কতক্ষণ এভাবে আটকে থাকতে হবে?’

মাস্টার জবাব দিলেন, ‘ছয় ঘণ্টা জোয়ার ছয় ঘণ্টা ভাটা। আবার ভরা জোয়ার পাওয়া যাবে বারো ঘণ্টা পরে। ততক্ষণ আটকায়ে থাকা উপায় নাই।’

কেউ কেউ প্রশ্ন করল, ‘এই জাহাজ চালাতে কত ফুট পানি লাগে?’

মাস্টার সাহেব স্কুল-মাস্টারদের ভঙ্গিতে জবাব দিলেন, ‘এই জাহাজ পানির নিচে ১২ হাত ডুবে থাকে। কমপক্ষে ১৩ হাত পানি লাগবে।’

ভাটা শুরু হওয়ার কারণে এই মুহূর্তে পানির গভীরতা কত হাতে নেমে এসেছে, সেটা অবশ্য তখনই দু-চারজন, যারা ভালো সাঁতার জানে, তারা পানিতে নেমে নিজেরাই হাত দিয়ে মেপে দেখার চেষ্টা করতে চাইছিল। মুরব্বি পর্যায়ের কয়েকজন ধমক দিয়ে তাদের ঠেকালেন।

জাহাজ চূড়ান্তভাবে ডুবোচরে আটকা পড়ার পর জাহাজের আরোহীরা কয়েকটি উপদলে বিভক্ত হয়ে গেল।

বিপদ-আপদের সময় যে দলটার মাথা সবচেয়ে ঠান্ডা আর চিন্তাভাবনা খুব প্রাকটিক্যাল, তারা দ্রুত হিসেব করে বের করলÑ জাহাজ যেহেতু ঠিক সকাল ১০টার দিকে আটকে গেছে, তার মানে পরিপূর্ণ জোয়ার আসার পর আবার ঠিক রাত ১০টার সময় এই বন্দিদশা থেকে ছাড়া পাওয়া যাবে। কাজেই অযথা মন খারাপ করে কাজ নেই। এই সময়টা আড্ডা দিয়ে, গান গেয়ে, খেলাধুলা করে সময় কাটানো যাক।

যে দলটার মধ্যে সারাক্ষণ কোনো না কোনো অ্যাডভেঞ্চার করার ঝোঁক, তারা দ্রুত নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় কথাবার্তা শেষ করে ঝটিকা পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলল। জাহাজের পেছনে ছোট যে নৌকা বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে, সেটা নিয়ে তারা কটকা ঘুরে আসতে যাবে।

এই পরিকল্পনা গোপন রাখার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা জাহাজের প্রত্যেকেই কীভাবে কীভাবে শুনে ফেলল এবং কম-বেশি প্রত্যেকেই বুকে থাবা মেরে ঘোষণা দিল, তারা সবাই ওই নৌকায় চড়ে কটকা ঘুরতে যেতে চায়।

যেহেতু নৌকাটা খুব ছোট। একসঙ্গে ১৫/২০ জনের বেশি উচিত হবে না। কিন্তু কটকা ঘুরে আসতে চায়, এমন মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে একশ, কাজেই অবিলম্বে সেই ঝটিকা পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল। কাকে বাদ দিয়ে কে যাবে। কাজেই কারও যাওয়ার দরকার নেই।

১৫/২০ জন যদি শেষ পর্যন্ত লুকিয়ে-লুকিয়ে অন্যদের বাদ দিয়ে কোনোভাবে নিজেরা নৌকা নিয়ে রওনা দেওয়ার চেষ্টাও করে, অবশিষ্ট ৮০/৮৫ জন তা টের পেয়ে গেলে নিঃসন্দেহে সেই নৌকা সবাই মিলে ডুবিয়ে দেবে। অতএব কেউই আর একা একা নৌকা নিয়ে কটকা যাওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি হলো না।

জাহাজের আরোহীদের মধ্যে যারা একটু হতাশাবাদী ধরনের, তারা এই বিরল পরিস্থিতির সুযোগ হাতছাড়া করল না। অনেককেই দেখা গেলÑ আশেপাশের লোকজনকে শুনিয়ে শুনিয়ে নানা রকম ভয়ানক হতাশার গল্প আর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছে।

বিপদ-আপদ আর দুর্ভাগ্যের সময়গুলোতে বেশিরভাগ মানুষ হতাশাবাদী কথাবার্তা আর কাহিনিতে খুব তাড়াতাড়ি প্রভাবিত হয় এবং সাধারণত এসব প্রসঙ্গে কথা বলতে আর শুনতেও ভালোবাসে।

বঙ্গোসাগরের অদৃশ্য ডুবোচরে অন্তত বারো ঘণ্টার জন্যে আটকা পড়ায় এবং হাতে সে রকম কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম না থাকায় এবং ছোট নৌকায় চড়ে চট করে কটকা ঘুরে আসার সুযোগও নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ জনতাকে দেখা গেল হতাশাবাদী বক্তাদের চারপাশে গোল হয়ে বসে মন দিয়ে তাদের হতাশাবাদী কথাবার্তা শুনতে শুরু করেছে।

একজন হতাশাবাদী বলছেন, ‘জানেন না তো সেইবার কী হলো…। আমার খালুর কার্গো জাহাজের ব্যবসা। ষোলটা কার্গো জাহাজ আছে উনার। দেশের এই মাথা থেকে ওই মাথা শুধু বালু পরিবহন করে। পুরাই লাভে লাভ। একবার হলো কি, …সবচেয়ে বড় কার্গো জাহাজটা গেছে কুড়িগ্রাম। সেখানে তিস্তা থেকে বালু তুলবে। তারপর আসবে নারায়ণগঞ্জ। বালু-টালু লোড করা শেষ। ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। কিন্তু জাহাজ তো আর নড়ে না। কী হইসে? পানি নেমে গেছে। বর্ষাকাল শেষ। পানি কম। মিনিমাম যে ডেপথ দরকার, সেটা নাই। জাহাজ ভাসাতে ভরা জোয়ার লাগবে। জোয়ারের জন্যে অপেক্ষা শুরু হইল। জোয়ার আসে যায়। কিন্তু জাহাজ ভাসে না। সেই ভরা জোয়ার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কতদিন লেগেছিল, জানেন?… অনুমান করেন তো দেখি?’

একেক জন বিস্ময় ভরা কণ্ঠে অনুমান করতে থাকেÑ ‘তিন দিন’, ‘সাত দিন’, ‘পনের দিন’।

হতাশাবাদী বক্তা রসিয়ে রসিয়ে বিস্মিত শ্রোতাদের বিস্ময় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘হয় নাই। পুরা এক বছর লেগেছিল। আবার বর্ষা আরম্ভ হয়েছে। তারপর সেই জাহাজ ছুটায়ে আনতে হয়েছে। চিন্তা করেন ব্যাপারটা।’

আরেক হতাশাবাদী বক্তা আরেক জায়গায় আসর জমিয়ে বসেছেন। তিনি বলে যাচ্ছেন, ‘এ রকম ক্ষেত্রে কী হয় জানেন? পানি নামতে নামতে একদম নেমে যায়। পুরা মরুভূমি। এত বড় জাহাজটা তো আর এমনি এমনি পানি ছাড়া দাঁড়ায়ে থাকতে পারবে না। একটু পরে কাত হয়ে উল্টায়ে যাবে। কাজেই ভাইয়েরা একটু সাবধান থাকবেন। পানি বেশি নেমে গেলে, আগেই লাফ দিয়ে পানিতে নেমে গিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়ে অপেক্ষা করবেন।’

বেকুব প্রকৃতির কোনো শ্রোতা হয়তো ফস করে প্রশ্ন করে ফেলেন, ‘কীসের জন্যে অপেক্ষা করব ভাইজান?’

হতাশাবাদী বক্তা বিরক্ত হয়ে জবাব দেন, ‘আজিব। জাহাজ তৈরি হয়েছে পানিতে ভাসার জন্যে। পানি না থাকলে শুধু মাটির উপর তো আর দাঁড়ায়ে থাকতে পারবে না। কখন উল্টায়ে পড়ে, তার ঠিক আছে? যদি উল্টায়ে পড়ে তাহলে তো আপনার মাথার উপর পড়বে। এ জন্যে দূরে সরে দাঁড়াতে বলেছি। আর যদি আগেই না নামেন, তাহলে তো জাহাজের ভিতর আটকা পড়বেন। এই বিরল এলাকায় কে আপনাকে উদ্ধার করবে? বুঝতে পেরেছেন ব্যাপারটা? চাপা যখন পড়বেন, তখন বুঝবেন। স্যান্ডেল দিয়ে বাড়ি দিলে তেলাপোকা কেমন করে চ্যাপটা হয়ে যায়, দেখেছেন কখনও? একদম ওই রকম চ্যাপটা হয়ে যাবেন। জাহাজ কেটে পরে যখন উদ্ধার করবে, তখন আপনার চ্যাপটা বডি পাওয়া যাবে।’

নিজেদের চ্যাপটা বডির দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠতে, অনেকেরই মুখ-চোখ শুকিয়ে গেল।

জাহাজের আরেক দিকে আরেক হতাশাবাদীকে দেখা গেল ষড়যন্ত্র করার ভঙ্গিতে তার সামনে উপস্থিত শ্রোতাদের ভয় দেখাচ্ছেন, ‘কী হয় জানেন তো? এইভাবে যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবোচরে আটকা পড়ে। ডাকাতরা আগে থেকেই অপেক্ষা করে থাকে। জাহাজ আটকা পড়া মাত্র তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির হয়ে যায়। তারপর তো বোঝেনই…।’

কেউ কেউ প্রশ্ন করল, ‘এই গভীর সমুদ্রেও কি ডাকাত আছে নাকি?’

এই বক্তাও বেকুব প্রশ্নকর্তার দিকে চোখ গরম করে তাকান, ‘গভীর সমুদ্র কোথায় দেখলেন? আমরা তো তীরের খুব কাছেই আছি। আর এই অঞ্চল তো ডাকাতের জন্যে বিখ্যাত। আগে শোনেন নাই? সুন্দরবনে আজকাল তো আর বাঘ-টাঘ তেমন নাই। ডাকাতরা সব মেরে সাফ করে ফেলেছে। পেপারে পড়েন না, মুক্তিপণের দাবিতে জেলে অপহরণ? এই অঞ্চল পুরাটাই জলদস্যুদের দখলে। সবাই একটু তৈরি থাকেন। যে কোনো সময় ডাকাত দল চলে আসবে।’

কেউ কেউ (ভয়ে) প্রশ্ন করল, ‘ডাকাতরা সত্যি সত্যি চলে আসবে?

বক্তারা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘সত্যি সত্যি না মিথ্যা-মিথ্যি কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারবেন। একটু অপেক্ষা করেন। নিজে চোখেই দেখবেন।’

‘ডাকাতরা আসার পর আমরা কী করব?’

বক্তা এইবার একটু উদাস ভঙ্গিতে আশেপাশে তাকান, ‘কী করবেন, সেটা আমি কেমন করে বলব? দৌড় দিবেন অথবা পলায়া থাকবেন।’

আমি ঘুরে ঘুরে এইসব তামাশা দেখছিলাম। এই সময় একজন আমাকে পাকড়াও করলেন, ‘এই যে মিস্টার। আপনি না আমাদের গাইড?’

আমি থতমত খেয়ে বললাম, ‘আমি? কই, না তো…।’

ভদ্রলোক হুংকার দিয়ে বললেন, ‘অবশ্যই আপনি আমাদের গাইড। তখন দেখলাম, সুন্দরবন নিয়ে লেকচার দিচ্ছেন। আপনিই তো আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসলেন। এখন বলেন, আপনি ভুল পথ দেখালেন কেন? আমরা এখানে আটকা পড়লাম কেন?’

‘আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি সুন্দরবন আগে কয়েকবার এসেছি বলে সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছি। আমি আপনাদের গাইড না। আমি পথ দেখিয়ে আনি নাই।’

ভদ্রলোক ক্রুদ্ধ গলায় শাসানোর ভঙ্গিতে বললেন, ‘এখন অস্বীকার করে লাভ নাই। আপনিই ভুল পথে নিয়ে এসেছেন। আমাদের এই অবস্থার জন্যে আপনি দায়ী। দাঁড়ান, একটু পরে আপনার ব্যবস্থা করতেসি।’

আমি ব্যবস্থা করা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম না। তাড়াতাড়ি ওই ভদ্রলোকের সামনে থেকে সরে এলাম। কী কারণে উনি এই ধারণা করে বসে আছেন যে আমি গাইড, কে জানে। কিন্তু তার সামনে থাকা ঠিক হবে না। বাই চান্স, ধাক্কা দিয়ে যদি পানিতে ফেলে দেন!

 

৭.

আমি বোধহয় কেবিনে এসে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।

হঠাৎ সেই ঘুম ভাঙার পরে মনে হলো আমি একটা স্টেডিয়ামের মধ্যে আছি। বার্সেলোনা আর রিয়াল মাদ্রিদের খেলা চলার সময় স্টেডিয়ামে যে রকম গর্জন শোনা যায়, সে রকম আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

কেবিনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই হতভম্ব হয়ে গেলাম। যতদূর মনে পড়ে, আমরা খোলা সমুদ্রের মধ্যে আটকা পড়েছিলাম। চারিদিকে পানি আর পানি। বহদূরে সুন্দরবনের সবুজ গাছপালা দেখা যাচ্ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে ধূ-ধূ মাঠ।

আমি এক দৌড়ে কেবিনের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে আরও হকচকিয়ে গেলাম।

আমাদের জাহাজটা সত্যি সত্যি একটা মরুভূমির মতো বালুময় একটা ধূ-ধূ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ দিকে অনেক দূরে মরীচিকার মতো কিছু একটা চিকচিক করছে। ওটাই কি সমুদ্র? পানি নামতে নামতে সমুদ্রের মাঝখানে সত্যি সত্যি এত বড় চর জেগে উঠেছে?

জাহাজের প্রত্যেকেই দেখি হইহই করতে করতে নিচে নেমে গিয়েছে। কারা জানি বুদ্ধি করে ফুটবল নিয়ে এসেছিল, শুকনো বালুচরে এখন চলছে প্রীতি ম্যাচ। দুদল খেলতে নেমেছে। শ-খানেক দর্শক গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে তাদের উৎসাহ দিচ্ছে।

জীবদ্দশায় কত কী দেখার বাকি ছিল। এও দেখতে হলো।

একদিকে খেলা চলছে। আরেক দিকে চলছে ফটোসেশন। এ রকম দুর্লভ লোকেশনে ছবি তোলার সুযোগ তো আর সব সময় আসে না। ফটোগ্রাফারদের দম ফেলার সুযোগ নেই।

জেরিনকে দেখা গেলÑ বালুচরের মাঝখানে এক জায়গায় অল্প একটু পানি জমে ছিল, সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। একজন ফটোগ্রাফার বোধহয় টেলি-লেন্স লাগিয়ে অনেক দূর থেকে ছবি তুলছিল। একজন বীরপুরুষ সেই ফটোগ্রাফারকে খেয়াল করেনি, সে ভেবেছে জেরিন বোধহয় পানিতে পড়ে গেছে। সে টারজানের মতো ‘আ-আয়া’ চিৎকার দিয়ে পানিতে নেমে পড়েছে জেরিনকে উদ্ধার করতে।

জেরিন মহাবিরক্ত হয়ে চিল-চিৎকার দিয়ে উঠেছে, ‘উফ! দিলেন তো ছবিটা নষ্ট করে। যান তো এখান থেকে।’

বীরপুরুষ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে, তার ভুলটা কোথায় হলো।

এক নারী জাহাজ বাঁধার দড়ি দিয়ে বানানো একটা দোলনায় দোল খাচ্ছিলেন। সেই দোলনা হঠাৎ ছিঁড়ে গিয়ে তিনি দুম করে নিচে পড়ে গেছেন। তার কাপড়ে কাদায় মাখামাখি। তিনিও চিল চিৎকার দিচ্ছেন।

চারুকলার লোকজন এক জায়গায় বালু দিয়ে ভাস্কর্য বা ম্যুরাল জাতীয় কিছু একটা বানাচ্ছিল। আরেক নারী পরম উৎসাহ ভরে সেই ভাস্কর্য বানানোর কাজে যোগ দিয়েছেন। এই সময় মাটির ভেতর থেকে একটা কাঁকড়া বের হয়ে এসেছে। কাঁকড়া দেখে আতংকে সেই নারী যে চিল-চিৎকার দিয়েছেন, তাতে সুন্দরবনে যত চিল বসবাস করে, ভয় পেয়ে তাদের উড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা।

 এইসব তামাশামূলক কর্মকা- দেখতে দেখতে আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম, এই সময় একদল মানুষ আমাকে থামাল, ‘এই যে ব্রাদার। আমরা যে গভীর সমুদ্রে আটকা পড়েছি, সেটা মিডিয়াকে জানানো দরকার না?’

আমি চিন্তিত গলায় বললাম, ‘অবশ্যই জানানো দরকার। কিন্তু এখানে তো মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক নাই। কেমন করে জানাবেন?’

‘আরে ব্রাদার। আপনি না সাংবাদিক? আপনিই তো ভালো জানবেন, কেমন করে জানাবেন।’

‘হ্যাঁ। কিন্তু মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক না থাকলে এই খবর পাঠানোর তো কোনো উপায় নাই।’

‘ধুর। আপনি দেখি ভুয়া সাংবাদিক। ইরাকের ব্যাটল-ফিল্ড থেকে পর্যন্ত বিবিসি-সিএনএন লাইভ ভিডিও পাঠায়ে দেয়। আর আপনি এই খবর পাঠাতে পারবেন না?’

‘তাও ঠিক। কিন্তু এই খবর পাঠিয়ে লাভ কী?’

‘আপনি তো আশ্চর্য লোক। আরে… আমরা আটকে আছি, এই খবর জানলে, তখন প্রশাসনের টনক নড়বে। তারা আমাদের উদ্ধার করার ব্যবস্থা করবে।’

‘কেমন করে উদ্ধার করবে? এখানে তো আর কোনো জাহাজ আসার উপায় নেই।’

‘তাহলে হেলিকপ্টার পাঠাবে। আমরা কি সারা জীবন এখানে আটকে থাকব নাকি?’

‘তা অবশ্য ঠিক কথা।’

‘হেলিকপ্টার থেকে দড়ি ফেলবে। আমরা দড়ি বেয়ে উঠে যাব।’

সত্যি সত্যি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার চলে এলে কতজন মানুষ দড়ি ধরে ঝুলতে ঝুলতে উঠে যেতে পারবে কিংবা খবর প্রচারিত হলে সত্যি সত্যি প্রশাসনের টনক নাড়ানাড়ি শুরু হবে কিনা, তার চেয়েও বড় কথা এই জনবিরল ও মোবাইল নেটওয়ার্কশূন্য এলাকা থেকে কীভাবে খবর পাঠানো যাবেÑ এসব নিয়ে চাইলে অবশ্য তর্ক চালিয়ে যাওয়া যেত, আমি সেই আজাইরা ঝামেলায় গেলাম না।

চারদিকে নানাবিধ আজগুবি কা-কীর্তি দেখতে দেখতে এক সময় খেয়াল করে দেখি, সূর্য ডুবে যাচ্ছে। অনেক দূরের বালুকা বেলা এবং তারও চেয়ে দূরের দিগন্ত-রেখায় সমুদ্রের পানি যেখানে চিকচিক করছে, সেখানে গোধূলির চমৎকার আলো পড়ে অপূর্ব একটা দৃশ্য তৈরি করেছে। আগে থেকে পরিকল্পনা করে বা আয়োজন করে এই দৃশ্য দেখতে যাওয়া সম্ভব না।

প্রকৃতিপ্রেমী কয়েকজনকে দেখা গেল, তারাও মুগ্ধ হয়ে সূর্য ডুবে যাওয়ার সেই দৃশ্য দেখছে। কেউ কেউ ক্যামেরায় একের পর এক ছবি তুলে সেই দৃশ্য চিরদিনের জন্যে বন্দি করে রাখার চেষ্টা করছে।

সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে আসার পর প্রকৃতিতে খুব দ্রুত এক ধরনের শান্ত-সমাহিত ভাব চলে এলো। খেলা শেষ। ছবি তোলার কাজকর্মও শেষ। ভাটা শেষ হয়ে আবার জোয়ার আসার আয়োজন চলছে। শুকনো খটখটে বালুর মধ্যে এক ধরনের ভেজা ভেজা ভাব। সমুদ্র একটু আগেও ছিল দিগন্ত রেখার কাছাকাছি। একদম হঠাৎ করেই সেটা প্রায় কাছে চলে এসেছে। ধীরে ধীরে গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে যাওয়ার মতো পানিও উঠে গেল।

কাজেই সবাই আবার হইহই করে জাহাজে উঠে যেতে শুরু করল।

সকাল বেলা আচমকা ডুবোচরে আটকা পড়ে যাওয়ায় ট্যুর মাটি হলো বলে সবার মধ্যে একটা দুঃখ দুঃখ ভাব চলে এসেছিল। সেই অনুভূতি এখন আর কারও মধ্যে নেই। একেকজনকে দেখে মনে হচ্ছে, তাদের মতো সুখী আর পরিতৃপ্ত মানুষ এই পৃথিবীতে বিরল।

বেশিরভাগ মানুষের ভাবভঙ্গিও একদম স্বাভাবিক। জাহাজ এভাবে আটকা পড়বে, এটা আগে থেকে জেনে-বুঝেই যেন তারা এই অভিযানে এসেছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না জানলে কিছুতেই তাদের আনা যেত না।

 

৮.

জাহাজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আবারও শুরু হয়েছে ‘পাঙ্খা পাঙ্খা’ গান। সেই সঙ্গে পাঙ্খা নৃত্য। সেই নৃত্য একবার দেখলে, আমি নিশ্চিত, আফ্রিকার জংলি আদিবাসীরা চিরদিনের মতো নাচানাচি করা ছেড়ে দেবে।

জাহাজে এ মুহূর্তে কারও অবশ্য কিছু করারও নেই। বালুর মধ্যে খেলাধুলা আর হাঁটাহাঁটি করে সবার একটু একটু খিদে পেয়ে গিয়েছিল। তাদের গরম গরম পিঠা জাতীয় ¯œ্যাকস খেতে দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে কেউ একজন মাইকে ঘোষণা করে জানিয়ে দিল, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে নতুন আবিষ্কৃত যে চরে আমরা আটকা পড়ে আছি, সেই চরের একটা নাম দেওয়া হয়েছে।

পাঙ্খার চর!

বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে সেই নাম দারুণভাবে গৃহীত হলো। নামকরণ যে একেবারে উপযুক্ত হয়েছে, সে বিষয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই।

নামকরণের ঘটনায় উৎসাহের চোটে ‘পাঙ্খা পাঙ্খা’ গানের ভলিউম, যেটা নিরবচ্ছিন্ন বেজেই চলছিল, আরও বাড়িয়ে দেওয়া হলো।

রাতে সবাই যখন ডিনারের জন্যে লাইনে দাঁড়িয়েছে, তখন জাহাজের ইঞ্জিন স্টার্ট নেওয়ার শব্দ পাওয়া গেল।

জোয়ার আসতে শুরু করায় পানি বেড়েই চলেছে। এরই মধ্যে চারিদিকে থইথই ঢেউ দেখা যাচ্ছে। আরেকটু পানি বাড়লেই জাহাজ আগে-পিছে করে নড়ানোর চেষ্টা করা হবে।

জাহাজের মাল্লারা ইয়া বড় বড় বাঁশ নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে একবার জাহাজের সামনে যাচ্ছে আরেকবার পেছনে যাচ্ছে। বেশ একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিবেশ।

বড় বড় বাঁশ পানিতে ডুবিয়ে আবারও পানি মাপার চেষ্টা চলছে। মাল্লারা ফাইনাল সিগন্যাল দিলেই জাহাজ সামনে আগাবে।

জাহাজ মুক্ত করার আয়োজন চলছে। কাজেই ডিনারের জন্যে কেউ বেশি সময় নষ্ট করল না। সবাই খেয়ে দেয়ে হাত মুছে তাড়াতাড়ি ছাদে চলে গেল। কীভাবে শেষ পর্যন্ত মুক্তির ঘটনাটা ঘটতে যাচ্ছে, সেটা সামনে থেকে চাক্ষুষ করা দরকার।

এরই মধ্যে দেখি, আকাশে মস্ত বড় একটা চাঁদ উঠেছে। পানিতে সেই চাঁদের প্রতিফলন পড়ে ঢেউয়ের দোলায় দুলছে। অপূর্ব আর মায়াবী ব্যাপার স্যাপার।

আরও স্বস্তির ব্যাপার আমাদের জাহাজটাও একটু একটু করে নড়তে শুরু করেছে। সামনে পেছনে আগু-পিছু করিয়ে মুক্ত করার চেষ্টা করছেন মাস্টার সাহেব।

ঠিক রাত দশটার দিকে সত্যি সত্যি বন্দিদশা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে জাহাজ চলতে শুরু করল। একেকজন যে চিল চিৎকারটা দিল এবং ‘পাঙ্খা পাঙ্খা’ গানের মতো চিৎকার দিতেই থাকল এবং দিতেই থাকল, তাতে কী ভয়ংকর রক্ত হিম করা পরিবেশের যে সৃষ্টি হলো, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না।

জোয়ারের কারণে পানি বেড়েই চলেছে। আটকে যাওয়ার ভয় আপাতত কম।

যারা একটু বেশি জ্ঞানী মানুষ, তারা বললেন, ‘পূর্ণিমার সময় জোয়ারও বেশি হয়, ভাটাও বেশি হয়। এক্সট্রিম ভাটায় আমরা আটকে গিয়েছিলাম। আবার এক্সট্রিম জোয়ারে ছাড়া পেয়েছি।’

আকাশে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। পানিতে সেই চাঁদের আলো ঢেউয়ের দোলায় ভেঙেচুরে সহ¯্র টুকরো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে।

বারো ঘণ্টার বন্দিদশা থেকে শেষ পর্যন্ত মুক্তির আনন্দ। কনকনে ঠান্ডার মধ্যে হু-হু করা বাতাস। আর লাউড স্পিকারে ‘পাঙ্খা পাঙ্খা’ গান আর আদিম পাঙ্খা নৃত্য।

বড়ই বিচিত্র পরিবেশ।

 

৯.

আধঘণ্টার মধ্যে কটকা পৌঁছে যাওয়ার পরে তীরের কাছাকাছি একটা জায়গায় জাহাজ নোঙ্গর করা হলো।

সেখানে আগে থেকেই বিভিন্ন ট্যুরিজম কোম্পানির জাহাজ নোঙ্গর করে আছে। তারা নিয়মিত সুন্দরবনের ভেতরে বিভিন্ন এলাকায় চলাফেরা করে। পথঘাট সব হাতের তালুর মতো চেনা। তাদের এভাবে ডুবোচরে আটকা পড়ে থাকার ইতিহাস নেই।

জাহাজ থেকে নেমে আমরা কয়েকজন মিলে নৌকা নিয়ে চেনা একটা ট্যুরিস্ট জাহাজের কাছে গেলাম। আমাদের মাস্টার আর সারেংকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছি।।

সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমরা আর কটকায় নামব না। এক অভিযানে যথেষ্ট হয়েছে। সুন্দরবন পরে আবার সুযোগ-সুবিধামতো আসা যাবে। এবার নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে পারলেই সবাই খুশি।

ট্যুরিস্ট জাহাজের লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলে জানা গেল, তারা পরের দিন অনেক ভোরবেলা খুলনার উদ্দেশে রওনা হবে। আমাদের বিপদে পড়ার কথা শুনে তারা আমাদের গাইড করে নিয়ে যেতে রাজি হলো।

তাদের জাহাজটা অবশ্য একটু ছোট। সহজেই নদী ছেড়ে যখন-তখন খালের ভেতর দিয়ে শর্টকাট মারতে পারে। আমাদের জাহাজ অনেক বড় বলে সেটা সম্ভব হবে না। এ কারণে তাদের অল্প কিছু পথ ঘুরে যেতে হবে। তাতে তাদের আপত্তি নেই।

ঠিক হলোÑ ভোর চারটায় যখন তারা ইঞ্জিন স্টার্ট দেবে, তখন দুই-তিনবার ভেঁপু বাজাবে। আমাদের জাহাজ থেকেও পাল্টা ভেঁপু বাজিয়ে সংকেত দেওয়া হলে তারপর তারা রওনা দেবে।

আমি একটু আগ বাড়িয়ে পথের নিশানাও নিয়ে রাখলাম।

প্রথমে মাইলখানেক দক্ষিণে সাগরের দিকে নামতে হবে। তারপর হাতের ডানদিকে পড়বে বড় একটা খাল। সেই খালের আঁকাবাঁকা গতিপথ ধরে অনেকটা দূর যেতে হবে। তারপর এক সময় পড়বে বড় একটা নদী। সেটা ধরে এগিয়ে গেলেই খুলনা পৌঁছে যাব। একবার খুলনা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে আর চিন্তা নেই। বাকি পথ আমাদের জাহাজের মাস্টার, সারেং, সুকানি এরাই চিনে নিয়ে যেতে পারবে।

বিরাট স্বস্তি আর শান্তির ভাব নিয়ে আমরা আবার নিজেদের জাহাজে ফিরে এলাম।

সারাটা দিন যেভাবে ঝক্কি-ঝামেলাপূর্ণ অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে দিয়ে পার করতে হয়েছে, সেটাই নাকি অনেকের কাছে জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। বাড়ি ফিরে তারা সেই ঘটনা পরিচিত লোকজনের কাছে কীভাবে বীরোচিত ভঙ্গিতে গল্প করবে, সেটাও রিহার্সেল দিয়ে রাখল কেউ কেউ।

ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার পরে বিভিন্ন মানুষের ক্যামেরা মিলিয়ে কয়েক লাখ ছবি তোলা হয়েছে। সেগুলো ল্যাপটপে ডাউনলোড করে প্রজেক্টর লাগিয়ে একটা একটা করে দেখা হচ্ছে। সেখানেও একদল মানুষ বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখছে এবং ছবির পেছনে ঘটনা মনে করে হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের ওপর গড়িয়ে পড়ছে।

রাত বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে পুরো জাহাজের পরিবেশ বদলে গেল।

নতুন আরেকটা বছর এসে গেল। পুরনো বছর বিদায়।

সবাই হাসিমুখে পরস্পরকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা আর শুভ কামনা জানাচ্ছে। শুভ কামনাগুলো এ রকম:

‘আপনার নতুন বছর কোনো ডুবোচরে যেন আটকে না পড়ে, সেই কামনা করি।’

‘আপনার এই বছরে সব চর ডুবে যাক। ভরা জোয়ার আসুক। সব ব্যর্থতা, গ্লানি ভেসে যাক।’

‘আমাদের জাহাজ যেভাবে ধাক্কা-ধুক্কা খেতে খেতে চলেছে, আপনার জীবন যেন সে রকম না হয়।’

পাঙ্খা গান থামিয়ে কেউ কেউ নতুন বছর বরণ করে নেওয়া টাইপের গান দিয়ে নতুন বছর বরণ করার পরামর্শ দিল। সেটা করতে গিয়ে দেখা গেল, বাংলা ভাষায় নববর্ষ নিয়ে খুব বেশি গান নেই।

‘এসো হে বৈশাখ’ গেয়ে নিশ্চয়ই ইংরেজি নতুন বছর বরণ করা যায় না। কিন্তু আর কোনো গান না গেয়ে কয়েকজনকে এই গানটাই গাইতে হলো।

রাত্তিরে সবাই ঘুমাতে গেল অনেক দেরি করে।

…এবং যথারীতি ‘পাঙ্খা পাঙ্খা’ গান শুনতে শুনতে।

 

১০.

পরদিন আমার যখন ঘুম ভাঙল, তখন মনে হয় বেশ ভালোই বেলা হয়ে গিয়েছে।

আমি কেবিনের জানালা দিয়ে দেখি বাইরে প্রচ- কুয়াশা। বেশি দূর দৃষ্টি চলে না। জানুয়ারির প্রথম দিন। ঘোর শীতকাল। কুয়াশা তো থাকারই কথা।

অবশ্য একটু অবাক লাগলÑ জাহাজটা একটু বেশিই দুলছে। সুন্দরবনের ভেতরে তো এত ঢেউ হওয়ার কথা না যে জাহাজটা কলম্বাসের জাহাজের মতো একবার ডানে একবার বামে দোল খেতে থাকবে।

ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনে মনে হলো, ভালো স্পিডেই চলছে। কিন্তু ঢেউ অনেক বেশি আর বড়। জাহাজের সামনের দিকে খোলে বড় বড় ঢেউ এসে বাড়ি মারছে। সেই আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তাতে প্রকা- জাহাজটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।

ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি সময় সকাল সাড়ে দশটা।

আমি হাত-মুখ ধুয়ে আস্তে-ধীরে ওপরের ডেকে মাস্টার ব্রিজের দিকে গেলাম। একে তো প্রচ- ঠান্ডা। তার ওপর জাহাজের ভয়ংকর দুলুনিতে ঠিকমতো হাঁটাচলা করাও মুশকিল।

আমি মাস্টার আর সারেংকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমরা এখন কোথায়?’

মাস্টার সাহেব যেহেতু কথা বলেন অল্প, তার হয়ে সারেং নির্বিকার মুখে জবাব দিল, ‘দরিয়ায়।’

‘দরিয়ায় তো বুঝলাম। কোন জায়গা এটা?’

‘কইতে পারি না।’

‘আগের জাহাজ কই?’

‘কোন জাহাজ?’

‘ওই যে কালকে রাতে যে কথা হলো। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা।’

‘ওই জাহাজ হারায়ে ফেলছি।’

‘তাই নাকি? কখন হারালেন?’

‘পরথমেই হারায়ে ফেলছি।’

‘মানে? ওই জাহাজ ফলো করে আসেন নাই?’

‘না তো। কুয়াশার মধ্যে হারায়ে গেছে।’

আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘বলেন কী! কখন হারিয়েছেন?’

সারেংয়ের সঙ্গে এরপর কথোপকথনে যেটা বুঝলাম, ভোর চারটার সময় ওই জাহাজ ঠিকই ভেঁপু বাজিয়েছিল। আমাদের জাহাজ থেকেও ভেঁপু বাজানো হয়েছিল। এরপর দুটো জাহাজই চলতে শুরু করে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে গভীর কুয়াশায় সামনের ট্যুরিস্ট জাহাজ অদৃশ্য হয়ে যায়।

রওনা হওয়ার পরে কিছু দূর গিয়ে ডানপাশে একটা খালের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সামনের জাহাজ হারিয়ে গেছে। আমাদের জাহাজের মাস্টার ও সারেংও ঘন কুয়াশার মধ্যে আগ বাড়িয়ে আন্দাজের ওপর ভরসা করে ডানদিকে কোনো খাল খোঁজার চেষ্টা করেনি। তারা নিশ্চিন্ত মনেফুল স্পিডে দক্ষিণ দিক বরাবর চালিয়ে এসেছে।

আমি আতংকিত হয়ে বললাম, ‘আশ্চর্য! আপনাদের কি একটুও জিওগ্রাফিক্যাল সেন্স নাই? দক্ষিণ দিকে চালিয়ে চলে এসেছেন। দক্ষিণে কোথায় পৌঁছাবেন, জানেন?’

সারেং নিশ্চিন্ত মনে হুইল হালকা ডানে-বায়ে করতে করতে বলল, ‘পৌঁছাব কোনো একখানে। কোথাও না কোথাও তো ডাঙা ঠেকবেই।’

‘ডাঙা ঠেকবে মানে? এভাবে দক্ষিণে সোজা চালাতে থাকলে সোজা অ্যান্টার্কটিকা নয়তো অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে পৌঁছাবেন। তার আগেই জাহাজের তেল ফুরিয়ে যাবে। খাবার ফুরিয়ে যাবে। অথবা ঢেউয়ের ধাক্কায় আপনার এই জাহাজ ডুবে যাবে।’

সারেং অভয় দিয়ে বলল, ‘আরে। ঘাবড়ায়েন না। কিছু না কিছু পাবই।’

আমার আর এই নির্বোধ লোকটার সঙ্গে কথা বাড়ানোর ধৈর্য্য কুলাল না, চিৎকার করে বললাম, ‘জাহাজ ঘোরান। এক্ষন জাহাজ ঘোরান।’

মাস্টার আর সারেং মহাবিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জাহাজ ঘুরায়ে কোন দিকে যাব?’

আমি আরও জোরে বললাম, ‘উল্টো দিকে যাবেন। সোজা উত্তর দিকে যাবেন।’

‘আমাদের কম্পাস নষ্ট।’

আমি প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলাম, ‘কম্পাস নষ্ট! কম্পাস ছাড়াই জাহাজ চালাচ্ছেন? …জাহাজ থামান। এক্ষণ জাহাজ থামান। তারপর পুরা ইউ-টার্ন নেন। সোজা উত্তরে যাবেন।’

আমার কথামতো জাহাজ ঘুরিয়ে ফেরার কোনো ইচ্ছা সারেংয়ের ছিল না। তবে বয়স্ক মাস্টার সাহেব মনে হয় কিছুটা বিবেচক, তারা যে বিরাট গাধামি করে বসে আছের, সেটার গুরুত্ব তিনি আঁচ করতে পেরেছেন। কাজেই তিনি ইশারা দিলেন। সারেং বনবন করে হুইল ঘুরিয়ে সাগরের মধ্যে বিশাল একটা অর্ধবৃত্ত তৈরি করে উত্তরের পথ ধরল।

আমি মনে মনে হিসাব করলাম, ভোর চারটা থেকে সকাল সাড়ে দশটা পর্যন্ত সাড়ে ছয় ঘণ্টা জাহাজ এক নাগাড়ে ফুল স্পিডে চলেছে। তার মানে আমরা এরই মধ্যে কমপক্ষে এক-দেড়শ মাইল দক্ষিণে চলে এসেছি। অর্থাৎ গভীর সমুদ্র। বঙ্গোসাগরের একদম মাঝখানে।

‘পারাবাত-১’ নামক এই জাহাজ বানানো হয়েছে বাংলাদেশের নদীপথে চলাফেরা করার জন্যে। মোটেও গভীর সমুদ্রে চলার জন্যে না। তার মানে জাহাজের মাস্টার আর সারেংয়ের নির্বুদ্ধিতার কারণে আমরা অজান্তেই বিরাট বিপদের মধ্যে প্রবেশ করেছি।

আমার এই আশংকা যে অমূলক না, সেটার প্রমাণ দিতেই বোধহয় দশ-বারো ফুট উঁচু বিরাট এক ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল জাহাজের সামনের খোলে। পুরো নিচতলা পানিতে ভেসে গেল। আর যে ধাক্কা অনুভূত হলো এবং প্রচ- আওয়াজ হলো, পুরো জাহাজ থরথর করে কেঁপে উঠে দুলতে লাগল। আমরা মোটামুটি নিঃসন্দেহ ছিলামÑ এই ধাক্কায় অবশ্যই জাহাজের তলা ফেটে গিয়েছে এবং বিপুল বেগে পানি ঢুকছে।

ভাগ্য ভালো, তেমন কিছু হয়নি।

তবে এভাবে বড় বড় ঢেউয়ের ধাক্কা খেতে থাকলে তলা ফেটে যেতে বেশি সময় লাগার কথা না। এই জাহাজের খোল যেই ধরনের ইস্পাত দিয়ে তৈরি, তা নদীর মাঝারি সাইজের ঢেউ আর তার ধাক্কা সহ্য করতে পারে, সমুদ্রের বিরাট বিরাট সাইজের ঢেউ আর ধাক্কা মোটেও নয়।

একটু পরে পরে বিশাল বিশাল ঢেউ আসছে। জাহাজের সামনের অংশ গিলে খেয়ে ফেলবে মনে হচ্ছে। চারিদিকে এত কুয়াশা যে ঢেউগুলো আসলে ঠিক কত বড়, সেটাও প্রথম প্রথম বোঝা যায় না। একদম শেষ মুহূর্তে এসে যখন আছড়ে পড়ে, তখন সেটাকে দুইতলা সমান উঁচু পানির দানবের মতো দেখায়।

জাহাজের আরোহী অভিযাত্রীদের বেশিরভাগই হয়তো জীবনে প্রথমবারের মতো সুন্দরবনে বেড়াতে এসেছেন। নদী আর সমুদ্রের পার্থক্য করতে পারেন না। ঠিকপথে চলছে নাকি বেঠিক পথে চলছে, সেটাও তাদের ধরতে পারার কথা নয়। কিন্তু জাহাজের প্রবল দুলুনি আর বড় বড় ঢেউয়ের ধাক্কা থেকে সবাই অন্তত এটুকু বুঝে নিলেনÑ কিছু একটা গড়বড় নিশ্চয়ই হয়েছে।

আগের দিন ডুবোচরে আটকা পড়ার পরে সবার মধ্যে অনিশ্চয়তা, হতাশা আর বিরক্তির অনুভূতি হয়েছিল। গভীর সমুদ্রে অনিশ্চিত যাত্রায় ঝাঁকুনি আর দুলুনির কারণে এবার সেখানে জায়গা নিয়েছে নির্জলা আতংক।

কেউ আর কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করছে না। কেউ কোনো অভিযোগ করছে না। কেউ কোনো কথা বলছে না। যে যার মতো মন খারাপ করে চুপচাপ বসে আছে। কেউ কেউ দোয়া-দরুদ যা জানা ছিল, সেগুলো বিড়বিড় করে পড়েই যাচ্ছে। কেউ হয়তো সন্তান বা প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

কয়েকজনকে দেখলাম, মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে নেটওয়ার্কের সন্ধানে জাহাজের এখানে সেখানে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। কে জানে কেন।

আগের দিন যে দলটা আমাকে জাহাজ আটকা পড়ার খবর মিডিয়ায় প্রচারের ব্যবস্থা করার জন্যে চাপাচাপি করছিল, তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তাদের একজন মানুষ এগিয়ে এসে হাসিমুখে সুখবর দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, ‘শুনেছেন তো, ব্রেকিং নিউজ দিচ্ছে।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কীসের ব্রেকিং নিউজ?’

‘ও মা। জানেন না? আপনি না সাংবাদিক?’

‘আমি একজন ভুয়া সাংবাদিক। জি, এইবার বলেন, কীসের ব্রেকিং নিউজ?’

‘সবগুলি টিভিতে স্ক্রল দিচ্ছে, দেড়শ পর্যটক নিয়ে বঙ্গোপসাগরে জাহাজ নিখোঁজ।’

‘তাই নাকি? এখানে তো মোবাইল নেটওয়ার্কই নাই। মিডিয়া কেমন করে খবর পেল?’

মানুষটা তার চোখে-মুখে বিদ্রুপ ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘আপনি দেখি সত্যি সত্যি ভুয়া সাংবাদিক। নেটওয়ার্ক নাই কে বলল? ছাদে উঠলেই নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। আর মিডিয়া ঠিকই খবর পেয়েছে। আমার এক আত্মীয় এইমাত্র আমাকে ফোন করে জানাল। সে দেখেছে, টিভিতে ব্রেকিং নিউজ দিচ্ছে।’

‘ও আচ্ছা। তাহলে এরপর কী হবে?’

‘কী আর হবে। প্রশাসনের টনক নড়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের উদ্ধার করতে হেলিকপ্টার রওনা হবে।’

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘হেলিকপ্টার আসার পর কী করবেন? দড়ি বেয়ে উঠে যাবেন?’

মানুষটা জবাব না দিয়ে অন্য দিকে হাঁটা দিল। তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ খুব পরিষ্কারÑ বেকুব আর ভুয়া সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

 

১১.

উত্তর-দিকে ঘুরিয়ে নেওয়ার পর জাহাজ আরও তিন-চার ঘণ্টা চালানোর পরে বেশ কয়েকটা জেলে নৌকার দেখা পাওয়া গেল।

তাদের কাছাকাছি জাহাজ থামিয়ে আমাদের বিপদের বর্ণনা দেওয়ার পরে তারা খুবই অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকাতে লাগল। এ রকম বেকুবির ঘটনা তারা এর আগে কোনো দিন শোনেনি।

যা হোক, জেলেদের নৌকাবহর থেকে একটা নৌকা আমাদের কিছু দূর পথ দেখিয়ে উপকূল পর্যন্ত এগিয়ে দিতে রাজি হলো।

এর মধ্যে কুয়াশাও অনেকখানি কেটে গিয়েছে। অনেক দূর পর্যন্ত দিগন্ত দেখা যাচ্ছে। জেলে নৌকার পেছন পেছন ঘণ্টাখানেক চলার পর বহু দূরে সুন্দরবনের সবুজ অবয়ব ফুটে উঠতে শুরু করল।

জেলে নৌকার মাঝিরা আর কিছুটা এগিয়ে দিয়ে বিদায় নেওয়ার আগে আমাদের মাস্টার, সারেং এবং দায়িত্বশীল আরও কয়েকজনকে খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিল, উপকূলে পৌঁছানোর পরে অনেকগুলো খালে ঢোকার পথ পাওয়া যাবে। তার মধ্যে নির্দিষ্ট একটা খাল ধরে এগিয়ে যেতে হবে। সেই খালের ল্যান্ডমার্ক আর চিনতে পারার অন্য চিহ্নগুলোও খুব ভালো করে বুঝে নিল আমাদের লোকজন।

সত্যি সত্যি ঘণ্টাখানেক পরে আমাদের প্রকা- জাহাজ সেই খালের ভেতর যখন ঢুকে গেল, তখন একেকজনের যে কী আনন্দ হলো, তা আর বলার না।

আমাদের সেই দুঃসাহসিক সুন্দরবনের গল্প এখানেই মোটামুটি শেষ।

তারপরেও বলে রাখিÑ ঢাকা পর্যন্ত ফেরার পথে আর কোনো বিপদ ঘটেনি। শুধু খাবার আর পানি ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে নতুন করে আবার চাঁদা তুলে গ্রাম্য একটা বাজারের পাশে জাহাজ থামিয়ে চাল, ডাল, ডিম, সবজি আর মুরগি কিনতে হয়েছিল। আর যেদিন ঢাকায় এসে পৌঁছানোর কথা, নানা কারণে দেরি হয়ে যাওয়ায় তার ঠিক একদিন পরে এসে পৌঁছাতে হয়েছিল।

একদিন দেরি হওয়ায় অনেকেরই হয়তো অনেক রকম কাজকর্মের ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। তারপরও কেউ কিছু মনে করেনি। কেউ কোনো অভিযোগও করেনি।

দুর্ধর্ষ যে পাঁচটা দিন সবাই কাটিয়ে ফিরেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রত্যেকের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে, সে বিষয়ে কারও দ্বিমত ছিল না।

 

Scroll to Top